দুর্গাপুজো মানেই বাঙালির কাছে আনন্দ, উৎসব আর সাংস্কৃতিক চর্চার এক বিশেষ সময়। পুজোর মণ্ডপে মণ্ডপে যেমন মানুষের ভিড় জমে, তেমনই বিভিন্ন জায়গায় বসে বইয়ের স্টল। সেখানে পছন্দের বই কেনার পাশাপাশি সাহিত্য, ইতিহাস ও রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়েও চলে আলোচনা। কিন্তু এবছর দুর্গাপুজোর আবহে বামপন্থীদের বুকস্টল ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, উৎসবের মরশুমে বই এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জায়গা কতটা সুরক্ষিত?
এবছর দুর্গাপুজোর সময় রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় বামপন্থীদের বইয়ের স্টল ভাঙচুর এবং বই ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগ সামনে এসেছে। এই ঘটনাগুলি ঘিরে রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যেও আলোচনা তৈরি হয়েছে। বইয়ের স্টলকে কেন্দ্র করে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে। বিশেষ করে সাহিত্যিকদের লেখা বই ছিঁড়ে ফেলা বা মাটিতে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ ঘিরে প্রশ্ন উঠছে, রাজনৈতিক মতাদর্শের বিরোধিতা করতে গিয়ে বইয়ের প্রতি অসম্মান দেখানো কতটা যুক্তিসংগত?
এই পরিস্থিতিতেই সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অভিনেতা জয়জিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর পোস্টে উঠে এসেছে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় লেখক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের নাম এবং তাঁর লেখা ‘পথের দাবী’ উপন্যাসের প্রসঙ্গ। অভিনেতা লিখেছেন, ‘শরৎচন্দদার কাউন হ্যায়? পথেরদাবী জঙ্গি পুস্তক হ্যায়। তাই ছিঁড়ে মাটিতে ফেলে পা দিয়ে মাড়িয়ে দিয়েছে।’ তাঁর এই বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে বইটিকে জঙ্গি পুস্তক বলে দাগিয়ে দেওয়ার মানসিকতা এবং সেই অজুহাতে বই ছিঁড়ে ফেলার ঘটনাকে কটাক্ষ করতে চেয়েছেন তিনি।
এরপরই অভিনেতা লেখেন, ‘ওরে সরস্বতী ভাবি রে বই কে। পা লাগলে প্রণাম করি।’ এই কথার মধ্যে দিয়ে বইয়ের প্রতি বাঙালির শ্রদ্ধা এবং শিক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন জয়জিৎ। সরস্বতীকে বিদ্যা ও জ্ঞানের দেবী হিসেবে মানা হয়। সেই জায়গা থেকে বইকে সম্মান করার যে ঐতিহ্য বাঙালির সংস্কৃতিতে রয়েছে, তার সঙ্গে বই ছিঁড়ে মাটিতে ফেলে দেওয়ার আচরণের বিরোধ তুলে ধরেছে তাঁর বক্তব্য। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পথের দাবী’ উপন্যাসটি ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে লেখা একটি উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম। ফলে রাজনৈতিক মতবিরোধ থাকলেও একটি বইয়ের প্রতি এমন আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিনেতা।
আরও পড়ুনঃ ‘কোন সভ্য দেশের সভ্য সরকার বই সরাতে বু*লডোজার আনে না’, দুর্গাপুজোয় বামেদের বুকস্টল ভাঙা নিয়ে বি*স্ফোরক সুদীপ্তা চক্রবর্তী! “গাঁ’জার ঠেক, জু’য়ার আড্ডা থেকে রাজনৈতিক দুর্নীতি, এত কিছু থাকতে বইয়ের স্টলেই কেন বু*লডোজার?” প্রশ্ন তুললেন অভিনেত্রী!
সবশেষে জয়জিৎ লেখেন, ‘আর কিছু বাঙালি এখন কমেন্টে এসে ঠিক করেছে বলবে। হায়রে বাঙালি।’ তাঁর এই মন্তব্যে স্পষ্ট, বই ছিঁড়ে ফেলার ঘটনা নিয়ে নীরবতা কিংবা সেই কাজকে সমর্থন করার প্রবণতা নিয়েও তিনি অসন্তুষ্ট। রাজনৈতিক মতাদর্শের বিরোধিতা কি সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চার প্রতি অসম্মানের কারণ হতে পারে? জয়জিতের পোস্ট ঘিরে সেই প্রশ্নই আবার সামনে এল। তবে এই ঘটনায় বাঙালির সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা নিয়ে কী প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, এখন সেদিকেই নজর।






