“আমার ছোটবেলাটা খুব টাফ ছিল, বাবা চাইতেন না মেয়ে ডাক্তার হোক তাই ২১ বছরেই আমার বিয়ে দিয়ে দেন…” কেন মেয়ের স্বপ্নের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন বাবা? চিকিৎসক, অভিনেত্রী ও সমাজসেবী, এক জীবনে এত পরিচয়! স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ, দীপান্বিতা হাজারির পাঁচ দশকের পথচলা আজও অনুপ্রেরণা!

চিকিৎসক হিসেবে দীর্ঘদিনের পরিচিতি, তার পাশাপাশি মডেলিং, অভিনয়, সংসার সামলানো এবং মাতৃত্বের দায়িত্ব। এক জীবনে এতগুলি পরিচয় একসঙ্গে সামলানো কি সত্যিই সম্ভব? কথা হচ্ছে অভিনেত্রী ও চিকিৎসক দীপান্বিতা হাজারিকে নিয়ে। বর্তমানে তাঁকে ‘সাত পাকে বাঁধা’ ধারাবাহিকে অভিনয় করতে দেখছেন দর্শক। তবে পর্দার পরিচয়ের বাইরেও তাঁর জীবনের রয়েছে একাধিক দিক। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নিজের কর্মজীবন, অভিনয়ে আসার নেপথ্যের গল্প, চিকিৎসক হিসেবে অভিজ্ঞতা এবং ব্যক্তিগত জীবনের নানা অজানা কথা ভাগ করে নিয়েছেন তিনি। সেই সঙ্গে উঠে এসেছে তাঁর ছোটবেলার কঠিন সময়ের কথাও।

চিকিৎসক হিসেবে দীর্ঘ ৩২ বছর কলকাতা পুরসভার অধীনে কাজ করেছেন দীপান্বিতা। দর্জিপাড়া মাতৃসদনে সুপারিনটেনডেন্টের দায়িত্বও সামলেছেন। কিন্তু চিকিৎসার পাশাপাশি অভিনয় ও মডেলিংয়ের জগতে কীভাবে এলেন তিনি? অভিনেত্রীর কথায়, এর নেপথ্যে রয়েছে ‘সানন্দা’ পত্রিকা এবং সম্পাদক অপর্ণা সেনের ভূমিকা। চিকিৎসা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তিনি পত্রিকায় লিখতেন। একবার জন্মনিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাঁর লেখা প্রচ্ছদ প্রকাশিত হওয়ার পর একদিনেই এক লক্ষ কপি বিক্রি হয়েছিল বলেও জানান তিনি। পরে বেশি বয়সে মা হওয়ার ঝুঁকি নিয়েও লেখেন। সেখান থেকেই মডেলিংয়ের প্রস্তাব আসে। প্রথমে রাজি হতে চাননি তিনি। সরকারি চাকরির নিয়ম মেনে অনুমতি নেওয়ার পর ৩৭-৩৮ বছর বয়সে প্রথম ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান। সেই ছবি প্রকাশিত হতেই তৈরি হয় অভাবনীয় সাড়া।

আজও তাঁর সাদা চুল নিয়ে বিশেষ আগ্রহ রয়েছে বিভিন্ন সংস্থার। অনেকেই তাঁকে চুলে রং না করার পরামর্শ দেন। অন্যদিকে, অভিনয়ের ক্ষেত্রেও নিজের পছন্দের শাড়ি ও গয়না ব্যবহার করেন তিনি। বর্তমানে ‘সাত পাকে বাঁধা’ ধারাবাহিকে কাজ করছেন। তবে সময়ের কথা মাথায় রেখে সপ্তাহে দু-তিন দিনের বেশি শুটিং করতে চান না। তবে অভিনয় করলেও চিকিৎসা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি দীপান্বিতা। সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট জানিয়েছেন, চিকিৎসা তিনি কখনও ছাড়েননি। নিজের চেম্বারে রোগী দেখেন, পাশাপাশি তাঁর সঙ্গে কাজ করা জুনিয়র চিকিৎসকরাও রোগীদের দেখাশোনা করেন। দীর্ঘ চিকিৎসক জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও তুলে ধরেছেন তিনি।

তাঁর কথায়, কোনও মেয়ে ভুল করে বা না জেনে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে তাকে বাঁচানো এবং সমাজের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনা কর্তব্য। তাঁর চিকিৎসাজীবনে গর্ভপাতের রোগীর সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি এসেছে বলেও জানান তিনি। বর্তমানে কমবয়সি মেয়েদের মধ্যে পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম বা পিসিওএসের সমস্যা বাড়ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অভিনেত্রী। অনিয়মিত ঋতুস্রাব, ওজন বেড়ে যাওয়া, মুখে ব্রণ ও অতিরিক্ত লোমের মতো সমস্যার কথা উল্লেখ করে তিনি এর পিছনে অনিয়মিত জীবনযাপন, শরীরচর্চার অভাব এবং খেলাধুলোর অভ্যাস কমে যাওয়াকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখেছেন। তাঁর মতে, ছোট থেকেই মেয়েদের হাঁটাচলা ও খেলাধুলোর অভ্যাস তৈরি করা জরুরি।

কিন্তু এত কিছুর মধ্যেও তাঁর জীবনের একটি অধ্যায় বেশ কঠিন ছিল। ছোটবেলার কথা বলতে গিয়ে দীপান্বিতা জানান, চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করা সহজ ছিল না। তাঁর কথায়, “আমার ছোটবেলাটা টাফ ছিল। বলতে গেলে, আমাকে ডাক্তারি পড়ানোর ব্যাপারে আমার বাবার একদমই সায় ছিল না।” অর্থাৎ চিকিৎসক হওয়ার পথে পরিবারের সমর্থনও প্রথম থেকেই পাননি তিনি। তবে সমস্ত বাধা পেরিয়ে নিজের পড়াশোনা শেষ করেন এবং চিকিৎসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। ব্যক্তিগত জীবনেও রয়েছে দীর্ঘদিনের পরিচয় ও সম্পর্কের গল্প। স্বামী পার্থর সঙ্গে ছোটবেলা থেকেই পরিচয় ছিল তাঁর। পাশাপাশি বাড়িতে থাকতেন তাঁরা। পরিবারের তরফেও তাঁদের বিয়ের কথা আগে থেকেই ঠিক করা ছিল বলে জানান অভিনেত্রী।

আরও পড়ুনঃ “বাংলার মেইনস্ট্রিম সিনেমাকে ‘গার্বেজ’ বলেছে, আবর্জনার সঙ্গে তুলনা করেছেন ওই স্বনামধন্য অভিনেতা তথা পরিচালক!” ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘চোখের বালি’ থেকে ‘বাড়িওয়ালি’, উদাহরণ টেনে কোন পরিচালককে আয়না দেখালেন কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায়? পাল্টা জবাবে কী যুক্তি তাঁর?

সাক্ষাৎকারে নিজের পারিবারিক গয়না ও পুরনো দিনের ঐতিহ্য ধরে রাখার কথাও বলেছেন তিনি। ঠাকুরমা, মা, দিদিমা ও শ্বশুরবাড়ির সূত্রে পাওয়া গয়নাগুলির প্রতি তাঁর বিশেষ টান রয়েছে। এমনকি পরিবারের পুরনো রুপোর বাসনপত্রও যত্ন করে রেখে দিয়েছেন। নতুন প্রজন্ম সেগুলি বিক্রি করে দেওয়ার কথা বললেও তিনি রাজি নন। সব মিলিয়ে চিকিৎসা, অভিনয়, সংসার এবং মাতৃত্বের পাশাপাশি নিজের পছন্দ ও পারিবারিক ঐতিহ্যকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে চলেছেন দীপান্বিতা। পর্দার বাইরের এই জীবনসংগ্রামের গল্পই নতুন করে চিনিয়ে দিল অভিনেত্রীকে।

You cannot copy content of this page