একসময় মঞ্চ থেকে টেলিভিশনের পর্দা, সর্বত্রই ছিল তাঁর অবাধ বিচরণ। অভিনয়ের দক্ষতা দিয়ে দর্শকদের মন জয় করেছেন, কাজ করেছেন বাংলা অভিনয় জগতের একাধিক নামী শিল্পী ও পরিচালকের সঙ্গে। অথচ আজ সেই অভিনেতাকেই নিজের ঘরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে গিয়ে লড়াই করতে হচ্ছে শরীরের সঙ্গে। তিনি প্রবীণ অভিনেতা শঙ্কর ঘোষাল। দীর্ঘদিন ধরে পারকিনসন্স রোগে (Parkinson’s disease) আক্রান্ত তিনি। ক্রমশ বেড়েছে শারীরিক সমস্যা, কমেছে চলাফেরার ক্ষমতা। ঠিকমতো চিকিৎসা না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। একসময় যাঁর জীবনের বড় অংশ জুড়ে ছিল অভিনয়, কাজ আর ঘুরে বেড়ানো, আজ তাঁর পৃথিবী কার্যত আটকে গিয়েছে বাড়ির চার দেওয়ালের মধ্যে। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে নিজের জীবনের লড়াই, অভিনয়ের স্মৃতি, আর্থিক অনটন এবং বর্তমান অসহায়তার কথা বলতে গিয়ে বারবার আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন অভিনেতা।
সাক্ষাৎকারে শঙ্কর ঘোষাল জানান, ২০২১ সাল থেকে তাঁর শরীরে কাঁপুনি শুরু হয়। তবে এই সমস্যার সূত্রপাত আরও আগে। বর্তমানে হাত-পা-সহ শরীরের বিভিন্ন অংশ ক্রমাগত কাঁপে। ঘাড় শক্ত হয়ে যায়, এদিক-ওদিক ঘোরাতেও অসহ্য যন্ত্রণা হয়। এমনকী বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ানো কিংবা পাশের ঘরে যাওয়াও তাঁর কাছে কঠিন লড়াই। পারকিনসন্সের পাশাপাশি শ্বাসকষ্ট, হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা, প্রস্টেটের সমস্যা এবং চোখে ঝাপসা দেখার মতো একাধিক শারীরিক সমস্যার কথাও জানান তিনি। চোখের ছানির সমস্যার চিকিৎসাও এখনও করানো সম্ভব হয়নি। অভিনেতার আক্ষেপ, সঠিক চিকিৎসা পেলে হয়তো কিছুটা স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারতেন। এখনও তাঁর কাছে অভিনয়ের কাজের প্রস্তাব আসে। কিন্তু শরীর সঙ্গ না দেওয়ায় সেই কাজ গ্রহণ করতে পারেন না।
কথায় কথায় আবেগ ধরে রাখতে না পেরে বলেন, একটু হাঁটার ব্যবস্থা করে দিলেই তিনি আবার কাজ করতে পারবেন। তাঁর কথায়, অভিনয়ের ইচ্ছা আজও মরেনি, শুধু শরীরটাই আর আগের মতো সঙ্গ দিচ্ছে না। অভিনেতার জীবনের গল্প শুনলে বোঝা যায়, আজকের এই পরিস্থিতির পিছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের পরিশ্রম এবং দায়িত্বের ইতিহাস। ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা ছিল তাঁর। মা ও দিদির উৎসাহে মাত্র ১১-১২ বছর বয়সে অভিনয়ের জগতে পা রাখেন। মহেন্দ্র গুপ্তের পরিচালনায় ‘টিপু সুলতান’ নাটকে অভিনয়ের সুযোগ পান। সেই সময় দৈনিক ১০ টাকা পারিশ্রমিক পেতেন। পরবর্তীকালে উত্তম কুমার, বিকাশ রায়, অনুপ কুমার, জহর গাঙ্গুলির মতো বিশিষ্ট শিল্পীদের সান্নিধ্য পেয়েছেন।
অভিনয়ের পাশাপাশি সংসারের দায়িত্ব সামলাতে চাকরিও করেছেন। মাত্র ৬০০ টাকা বেতনে কাজ শুরু করে দীর্ঘ সাত বছর চাকরি করেন। কখনও বড়বাজার থেকে কয়েকশো কেজি জিনিসপত্র কিনে বহন করতে হয়েছে, কখনও পারচেজ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজের দায়িত্ব সামলেছেন। সংসারে মা, স্ত্রী, সন্তান এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের দায়িত্ব ছিল তাঁর কাঁধে। তাই শুধু অভিনয় করে সংসার চালানো সম্ভব হবে না বুঝেই জীবনের একটা বড় সময় চাকরি ও অভিনয় একসঙ্গে চালিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু সেই দীর্ঘ কর্মজীবনের পরেও ভবিষ্যতের জন্য তেমন সঞ্চয় করে উঠতে পারেননি। অভিনেতার কথায়, পরিবারের দায়িত্ব সামলাতে গিয়েই সঞ্চয়ের কথা ভাবার সুযোগ হয়নি।
সবচেয়ে বেশি কষ্টের জায়গা হল, আজ চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতেও অন্যের সাহায্যের দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে তাঁকে। একসময় যাঁর পরিচিতি ছিল কাজের জগতে, আজ তাঁকেই কখনও আর্থিক সাহায্যের জন্য মানুষের কাছে হাত পাততে হচ্ছে। বিভিন্ন সময় কিছু মানুষ ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে অর্থসাহায্য করেছেন। কেউ পাঁচ হাজার, কেউ এক হাজার, আবার কেউ আরও বেশি টাকা পাঠিয়েছেন। কিন্তু সেই সাহায্যও নিয়মিত নয়। আর্টিস্ট ফোরামের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছিলেন বলে জানান অভিনেতা। তবে সেখান থেকেও প্রত্যাশামতো সাহায্য পাননি। একসময় আর্থিক পরিস্থিতি সামলাতে বাড়িতে পোশাক বিক্রির ব্যবসা শুরু করেছিলেন। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে সেই উদ্যোগও বেশিদিন চালিয়ে যেতে পারেননি।
সাক্ষাৎকারে কয়েকজনের সাহায্যের কথা বলতে গিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন তিনি। আবার যাঁরা একসময় পাশে দাঁড়িয়েও পরে সাহায্য বন্ধ করে দিয়েছেন, তাঁদের উদ্দেশেও অভিমান নয়, বরং ক্ষমা চেয়েছেন। বারবার বলেছেন, কারও মনে কষ্ট দিয়ে থাকলে তাঁকে যেন ক্ষমা করে দেওয়া হয়। তাঁর কথায়, ‘সৎ থাকার কষ্ট অনেক। সেই কষ্টটা যাঁরা সৎ থাকেন, তাঁরাই বোঝেন।’ চুরি করে সম্পত্তি গড়ার বদলে সৎভাবে জীবন কাটানোর যে মানসিক শান্তি, সেটাকেই আজও বড় করে দেখেন তিনি। তবে এত অসুস্থতা, অভাব আর অসহায়তার মধ্যেও অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা একটুও কমেনি শঙ্কর ঘোষালের। টলিউডের প্রতি তাঁর কোনও অভিযোগ নেই বলেও স্পষ্ট জানিয়েছেন। বরং এই ইন্ডাস্ট্রি তাঁকে অনেক কিছু দিয়েছে বলেই মনে করেন তিনি।
আরও পড়ুনঃ “আমাকে কেউ সুন্দর বলুক, একদম পছন্দ নয়!” “আমায় সুপুরুষ বা সুদর্শন বললে খুব কষ্ট হয়, আমি আ’ঘাত পাই!” রূপ ও চেহারার প্রশংসা শুনলেই কেন অস্বস্তিতে পড়েন সৌম্য বন্দোপাধ্যায়? জানেন, ছোটবেলায় মাকে নিয়ে ঘটে যাওয়া কোন ঘটনার ক্ষ’ত আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন অভিনেতা?
একসময় যাঁরা নিয়মিত কাজ দিতেন, সেই পরিচালকদের অনেকের সঙ্গেই আজ দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এখনও কাজের প্রস্তাব আসে, কিন্তু নিজের শারীরিক অক্ষমতার কারণে তা ফিরিয়ে দিতে হয়। সাক্ষাৎকারের শেষদিকে টলিউডের শিল্পীদের কাছে তাঁর বিনীত আবেদন, তাঁকে যেন ভুলে না যাওয়া হয়। একটু সুস্থভাবে হাঁটাচলা করতে পারলে আবারও অভিনয়ে ফিরতে চান তিনি। আর সেই ইচ্ছার কথা বলতে গিয়েই বারবার চোখের জল সামলাতে পারেননি প্রবীণ অভিনেতা। শুধু নিজের চিকিৎসা বা কাজের জন্য নয়, জীবনের শেষ সময়ে যাঁদের সঙ্গে কাজ করেছেন, যাঁরা কোনওদিন তাঁকে ভালোবেসেছেন, তাঁদের সকলের কাছেই ক্ষমা চেয়ে নিয়েছেন। একসময় মঞ্চ ও পর্দায় যাঁর অভিনয় দর্শকদের আনন্দ দিয়েছে, আজ সেই শিল্পীর একটাই চাওয়া, একটু ভালো চিকিৎসা, একটু স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলার ক্ষমতা এবং আরও একবার অভিনয় করার সুযোগ। শিল্পীর জীবনে আলো থাকে, কিন্তু সেই আলোর আড়ালে কতটা অন্ধকার জমে থাকতে পারে, শঙ্কর ঘোষালের বর্তমান জীবন যেন তারই এক মর্মস্পর্শী উদাহরণ।






