“আমাকে কেউ সুন্দর বলুক, একদম পছন্দ নয়!” “আমায় সুপুরুষ বা সুদর্শন বললে খুব কষ্ট হয়, আমি আ’ঘাত পাই!” রূপ ও চেহারার প্রশংসা শুনলেই কেন অস্বস্তিতে পড়েন সৌম্য বন্দোপাধ্যায়? জানেন, ছোটবেলায় মাকে নিয়ে ঘটে যাওয়া কোন ঘটনার ক্ষ’ত আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন অভিনেতা?

সুন্দর দেখতে হওয়া কিংবা গায়ের রং ফর্সা হওয়া, সমাজের একাংশের কাছে আজও যেন প্রশংসা পাওয়ার অন্যতম মাপকাঠি। অন্যদিকে, কারও গায়ের রং শ্যামলা বা চেহারা তথাকথিত সৌন্দর্যের সংজ্ঞার সঙ্গে না মিললেই জোটে নানা ধরনের কটাক্ষ। কখনও মজা করার ছলে, কখনও আবার পরিচিতদের আড্ডায় এমন মন্তব্য করা হয়, যা বাইরে থেকে নিছক ইয়ার্কি মনে হলেও যাঁকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়, তাঁর মনে গভীর ক্ষত তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ছোটবেলার এমন কিছু অভিজ্ঞতা মানুষের মনে দীর্ঘদিন থেকে যায়। এবার সৌন্দর্য নিয়ে সমাজের এই মানসিকতা এবং নিজের জীবনের এমনই এক তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ্যে আনলেন অভিনেতা সৌম্য ব্যানার্জি।

অভিনেতা সৌম্য ব্যানার্জি নিজের অভিনয় এবং কাজের পাশাপাশি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নিয়েও খোলামেলা কথা বলেছেন। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে সৌন্দর্য, গায়ের রং এবং মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে নিজের ছোটবেলার একটি ঘটনার কথা ভাগ করে নেন তিনি। তাঁর কথায়, অন্যরা যখন কাউকে সুন্দর দেখতে বলে প্রশংসা করেন, তখন অনেকেই আপ্লুত হন। কিন্তু তাঁর ক্ষেত্রে বিষয়টি একেবারেই আলাদা। সৌন্দর্য নিয়ে এমন প্রশংসা শুনলেও তিনি আনন্দিত হওয়ার বদলে অস্বস্তি অনুভব করেন। এর পিছনে রয়েছে ছোটবেলার একটি অভিজ্ঞতা, যা আজও তাঁকে মানসিকভাবে আঘাত করে।

সেই ঘটনার কথা বলতে গিয়ে সৌম্য জানান, ছোটবেলায় তাঁদের বাড়িতে মায়ের বন্ধুবান্ধব এবং পাড়াপড়শিরা আসতেন। একদিন তাঁদের মধ্যে কেউ মজা করে তাঁকে বলেন, তিনি নাকি তাঁর মায়ের সন্তান নন! কারণ সৌম্য ফর্সা, অথচ তাঁর মা কালো। কথাটি হয়তো উপস্থিত ব্যক্তিদের কাছে নিছক ইয়ার্কি ছিল, কিন্তু ছোট্ট সৌম্যর মনে তা গভীরভাবে দাগ কেটেছিল। অভিনেতার কথায়, সেই মুহূর্তে তাঁর ভীষণ খারাপ লেগেছিল। তিনি পাল্টা বলেছিলেন, তাঁর মা কালো হোন বা ফর্সা, তাতে কিছু যায় আসে না। তিনি তাঁর মা। ছোটবেলার সেই কথোপকথন যে আজও তাঁর মনে রয়ে গিয়েছে, তা স্পষ্ট তাঁর বক্তব্যে।

সৌম্য আরও জানান, জানেন না কেন, সেই ঘটনাটি আজও কোথাও গিয়ে তাঁকে আঘাত করে। সৌন্দর্য নিয়ে মানুষের অতিরিক্ত মাতামাতি তাঁর একেবারেই পছন্দ নয়। তিনি মনে করেন, একজন মানুষের চেহারা বা গায়ের রং তাঁর নিজের হাতে নেই। তাই এই বিষয়গুলি নিয়ে এত উত্তেজিত হওয়ার কোনও অর্থ হয় না। বরং একজন মানুষ নিজের চেষ্টায় যে কাজ করেন, যে কাজে তাঁর পরিশ্রম এবং অবদান রয়েছে, সেই বিষয়গুলি নিয়েই আলোচনা হওয়া উচিত। তাঁর কথায়, “আমি যেটা করেছি, আমার কাজটাকে, যেটাতে আমার এফর্ট আছে, সেটা নিয়ে বলো।” অর্থাৎ, চেহারা নয়, একজন মানুষের কাজ এবং যোগ্যতাই হওয়া উচিত তাঁর পরিচয়ের আসল মাপকাঠি।

আরও পড়ুনঃ দিনে চাকরি, অবসরে অভিনয়! শিশিরকুমার ভাদুড়ির হাত ধরে অভিনয়ের জগতে পা, কাজ করেছেন সত্যজিৎ-মৃণাল-তরুণ মজুমদারের সঙ্গে! শেষ বয়সেও দাপিয়ে অভিনয়, জন্মশতবর্ষে ফিরে দেখা হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বর্ণময় জীবন! নিউমোনিয়ায় আ’ক্রান্ত হয়ে মৃ’ত্যু, বাংলা চলচ্চিত্রের সেই পরিচিত মুখের জীবনের অজানা লড়াই জানেন?

সবশেষে সৌন্দর্যের সংজ্ঞা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেন অভিনেতা। তাঁর মতে, একজনের চোখে যিনি সুন্দর, অন্য কারও চোখে তিনি সুন্দর নাও হতে পারেন। তাই সৌন্দর্যকে কোনও নির্দিষ্ট মাপকাঠিতে বিচার করা যায় না। সৌম্যর কথায়, “পৃথিবীতে অসুন্দর বলে কিছু নেই একচুয়ালি।” মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলালে সৌন্দর্য দেখার ধারণাও বদলে যায়। ছোটবেলার একটি সামান্য মজার ছলে বলা কথা কীভাবে এত বছর পরেও একজন মানুষের মনে কষ্ট দিয়ে যেতে পারে, সৌম্যর অভিজ্ঞতা যেন সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়। বাহ্যিক সৌন্দর্যের প্রশংসার চেয়ে মানুষের কাজ, ব্যক্তিত্ব এবং অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া যে অনেক বেশি জরুরি, তাঁর বক্তব্যে উঠে এল সেই বার্তাই।

You cannot copy content of this page