অভিনয় জগতের মানুষরা শুধু পর্দায় চরিত্র ফুটিয়ে তোলেন না, অনেক সময় নিজেদের জীবন, অভিজ্ঞতা এবং সমাজকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরেন। তাঁদের কথার মধ্যে এমন অনেক পর্যবেক্ষণ থাকে, যা দৈনন্দিন জীবনের একেবারে সাধারণ অথচ অদেখা বাস্তবকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। কখনও তা সমাজের বৈষম্য, কখনও মানুষের মনস্তত্ত্ব, আবার কখনও জীবনের কঠিন সত্যকে অন্য চোখে দেখার সুযোগ করে দেয়। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে অভিনেতা দেবপ্রতিম দাশগুপ্তও এমনই এক অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেছেন, যা শুনে অনেকেই থমকে যেতে পারেন।
দেবপ্রতিম দাশগুপ্ত বাংলা থিয়েটার, টেলিভিশন এবং চলচ্চিত্র জগতের অত্যন্ত পরিচিত মুখ। দীর্ঘ অভিনয় জীবনে তিনি যেমন অভিনয়শিল্পী হিসেবে নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন, তেমনই চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক হিসেবেও তৈরি করেছেন আলাদা পরিচিতি। ‘পালান’, ‘বিসমিল্লাহ’, ‘এতু সরে বসুন’ এবং ‘কালিয়াচক: চ্যাপ্টার ১’-এর মতো একাধিক প্রজেক্টে তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে সমাজ, সংস্কৃতি ও মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণও গভীর। পাশাপাশি বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে সঙ্গীতেও আত্মপ্রকাশ করেছেন তিনি। বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়েও তাঁর স্পষ্ট মতামত প্রায়ই আলোচনায় উঠে আসে।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে কলকাতার রাত নিয়ে কথা বলতে গিয়ে দেবপ্রতিম দাশগুপ্ত বলেন, শহরের রাত তাঁর ভীষণ প্রিয়। সেই প্রসঙ্গেই তিনি বাগবাজারের একটি মরার খাটিয়ার দোকানের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর কথায়, গভীর রাতে সেই দোকানে গেলে একটি অদ্ভুত বিষয় চোখে পড়ে। একই খাটিয়ার দাম সবসময় এক থাকে না। কেউ যদি সাধারণভাবে গিয়ে দাম জানতে চান, তাহলে হয়তো ৪০০ টাকা বলা হবে। কিন্তু যদি কোনও শোকাহত মানুষ, যিনি বাড়ির কারও মৃত্যুর পরে কাঁদতে কাঁদতে সেই একই খাটিয়ার দাম জানতে যান, তাহলে সেই দাম হয়ে যেতে পারে ৮০০ টাকা। এই উদাহরণ টেনে অভিনেতা বোঝাতে চেয়েছেন, মানুষের মানসিক অবস্থাকেও অনেক সময় ব্যবসার অংশ করে তোলা হয়।
এই প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, যে মানুষ শোকের মধ্যে রয়েছে, সে তখন আর দরদাম করার অবস্থায় থাকে না। তার কাছে সেই মুহূর্তে প্রয়োজনই সবচেয়ে বড় বিষয়। ফলে বিক্রেতাও বুঝে যায়, এই ক্রেতা দাম নিয়ে তর্ক করবেন না। দেবপ্রতিমের মতে, এখানেই মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং বাস্তব জীবনের নির্মম দিকটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি মজার ছলে আরও বলেন, কে কীভাবে কাঁদছে, সেটাও নাকি অনেক সময় পরিস্থিতি বোঝার ইঙ্গিত দেয়। তাঁর বক্তব্যে যেমন রসবোধ ছিল, তেমনই ছিল সমাজের এক অস্বস্তিকর বাস্তবের ইঙ্গিত। খুব সাধারণ একটি ঘটনার মধ্য দিয়ে তিনি তুলে ধরেছেন, কীভাবে মানুষের অসহায় মুহূর্ত কখনও কখনও অন্যের কাছে লাভের সুযোগ হয়ে দাঁড়ায়।
আরও পড়ুনঃ “উত্তম কুমার নিজেই সুচিত্রা সেনকে ফোন করে বলেছিলেন, ‘রমা, তুমি ব্যাক করতে পারো দারুণ গল্প’, কিন্তু…” অঞ্জন চৌধুরীর হাত ধরেই একসঙ্গে পর্দায় ফেরার কথা ছিল কিংবদন্তি উত্তম-সুচিত্রা জুটির! তবু কেন ফিরলেন না তাঁরা? কী প্রতিক্রিয়া দিয়েছিলেন মহানায়িকা? জানেন, কোন ছবি? বহুদিন পর সেই অজানা তথ্য ফাঁস করলেন পরিচালক কন্যা রীনা চৌধুরী!
দেবপ্রতিম দাশগুপ্তের এই বক্তব্য ইতিমধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। অনেকেই তাঁর পর্যবেক্ষণকে বাস্তবসম্মত বলে মনে করছেন, আবার কেউ কেউ এটিকে সমাজের এক কঠিন সত্যের প্রতিফলন বলেও ব্যাখ্যা করছেন। সাক্ষাৎকারের এই অংশে তিনি কোনও ব্যক্তিকে আক্রমণ করেননি, বরং একটি বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে মানুষের আচরণ, ব্যবসায়িক মানসিকতা এবং শোকের মুহূর্তে মানুষের অসহায় অবস্থাকে সামনে এনেছেন। অভিনয়শিল্পী হিসেবে নয়, একজন সংবেদনশীল পর্যবেক্ষক হিসেবেও তাঁর এই বক্তব্য অনেক পাঠক ও দর্শককে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।






