‘সারা পৃথিবীতে পরিচয় দেওয়ার মতো শেষ কজন বাঙালি নারীর মধ্যে অন্যতম অপর্ণা সেন!’ কেন বর্ষীয়ান অভিনেত্রীর সামনে দাঁড়িয়ে আজও নিজেকে ‘খুব ছোট’ মনে হয় অভিনেত্রী তথা চিকিৎসক দীপান্বিতা হাজারীর? তাঁর জীবনের কোন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অপর্ণা সেনের নাম?

জীবনে ইচ্ছাশক্তি আর পরিশ্রম থাকলে একসঙ্গে একাধিক স্বপ্নও সফল করা সম্ভব। সেই কথারই উজ্জ্বল উদাহরণ অভিনেত্রী তথা চিকিৎসক ডাঃ দীপান্বিতা হাজারী। একদিকে চিকিৎসকের দায়িত্ব সামলানো, অন্যদিকে অভিনয় জগতেও নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করা দুই ক্ষেত্রেই তিনি সমান দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। ব্যস্ত পেশাগত জীবনের মধ্যেও অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসাকে কখনও হারিয়ে যেতে দেননি। বরং নিষ্ঠা, অধ্যবসায় এবং আত্মবিশ্বাসের জোরে তিনি প্রমাণ করেছেন, নিজের ইচ্ছাকে গুরুত্ব দিলে কোনও স্বপ্নই অধরা থাকে না।

ডাঃ দীপান্বিতা হাজারী একাধারে একজন সফল চিকিৎসক এবং প্রতিভাবান অভিনেত্রী। কলকাতার বেডন স্ট্রিটের হাজারী ক্লিনিকে তিনি দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা পরিষেবা দিয়ে আসছেন এবং রোগীদের কাছে অত্যন্ত বিশ্বস্ত চিকিৎসক হিসেবে পরিচিত। একইসঙ্গে টলিপাড়াতেও তিনি নিজের অভিনয় দক্ষতার ছাপ রেখেছেন। জি বাংলার জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘করুণাময়ী রাণী রাসমণি’-তে সিস্টার ক্যাথি চরিত্রে অভিনয় করে তিনি বিশেষ প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন। চিকিৎসা ও অভিনয় দুই ভিন্ন জগতের মধ্যে অসাধারণ ভারসাম্য বজায় রেখে তিনি নিজের পথ তৈরি করেছেন। বিভিন্ন টেলিভিশন অনুষ্ঠান ও সাক্ষাৎকারেও তাঁকে সামাজিক সচেতনতা এবং নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কথা বলতে দেখা যায়।

সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে কিংবদন্তি অভিনেত্রী ও পরিচালক অপর্ণা সেনকে নিয়ে নিজের গভীর শ্রদ্ধা এবং আবেগের কথা অকপটে তুলে ধরেন দীপান্বিতা হাজারী। তিনি জানান, অপর্ণা সেন তাঁর কাছে শুধুমাত্র একজন অভিনেত্রী নন, বরং একজন অসাধারণ মেধাবী মানুষ। তাঁর কথায়, “আমি ওনাকে অন্ধভাবে অ্যাডমায়ার করি। উনি একজন জিনিয়াস। সারা পৃথিবীর সামনে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার মতো শেষ কজন বাঙালি মহিলার মধ্যে উনি অন্যতম।” দীপান্বিতা আরও বলেন, তিনি অপর্ণা সেনের এতটাই বড় ভক্ত যে তাঁর সামনে দাঁড়ালে আজও নিজেকে খুব ছোট মনে হয়। সেই অনুভূতির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, কাঞ্চনজঙ্ঘা বা সমুদ্রের সামনে দাঁড়ালে যেমন মানুষ নিজের ক্ষুদ্রতা অনুভব করে, ঠিক তেমনই অনুভূতি তাঁর হয় অপর্ণা সেনের সামনে দাঁড়ালে। তাঁর মনে হয়, জীবনে এখনও তেমন কিছুই করে উঠতে পারেননি।

এরপর তিনি স্মৃতিচারণ করে জানান, একসময় অপর্ণা সেন নিজে তাঁকে একটি কাজের জন্য ফোন করেছিলেন। সেই মুহূর্তটি আজও তাঁর কাছে অবিস্মরণীয়। দীপান্বিতা বলেন, অপর্ণা সেনের কথা বলার ভঙ্গি একেবারেই অনন্য। অত্যন্ত মিষ্টি এবং সুরেলা কণ্ঠে তিনি বলেছিলেন, “আমরা তো ভেবেছি আপনাকেই এটা করতে হবে।” তবে সেই সময় সরকারি চাকরিতে থাকার কারণে অভিনয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমতির বিষয়টি সামনে আসে। দীপান্বিতা তখন অপর্ণা সেনকে জানান, সরকারি চাকরির জন্য তাঁকে আগে অনুমতি নিতে হবে। উত্তরে অপর্ণা সেন তাঁকে শান্তভাবে বলেন, “আপনি আগে পারমিশনটা নিয়ে নিন। আপনার কাজটা কী হবে, সেটা আমি ভেবে দেখব। আমি না ভেবে কোনও কথা বলি না।” অপর্ণা সেনের এই আন্তরিকতা, ধৈর্য এবং কাজের প্রতি দায়বদ্ধতা আজও তাঁকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে বলে জানান দীপান্বিতা।

আরও পড়ুনঃ “হিমালয় মাটির তলায় ছিল, ছোটবেলায় পড়াশোনা করলে তো জানবেন…সমালোচকরা ১ থাকবে, আমরা ১ লাখ ছাড়িয়ে যাব!” ছেলেকে নিয়ে সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে একগাল মাছি! ‘আপনি ভূগোলে ফেল করেছিলেন না?’ ‘সমুদ্রের তলায় জানতাম, মাটির নিচে কবে দিয়ে হল?’ আত্মবিশ্বাসী চৈতি ঘোষালকে পাল্টা খোঁচা নেটপাড়ার!

সাক্ষাৎকারে দীপান্বিতা হাজারী আরও জানান, এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তিনি পরিবারের সঙ্গেও আলোচনা করেছিলেন। তখন তাঁর মেয়ে খুব ছোট ছিল। বিষয়টি নিয়ে স্বামীর সঙ্গে কথা বললে তিনিও তাঁকে উৎসাহ দিয়ে বলেন, “না, করো। ঠিক আছে।” পরিবারের সেই সমর্থন এবং অপর্ণা সেনের বিশ্বাস এই দুইয়ের মিলিত শক্তিই তাঁর অভিনয় জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। আজও অপর্ণা সেনের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা একটুও কমেনি। বরং সময়ের সঙ্গে সেই সম্মান আরও বেড়েছে, যা তাঁর প্রতিটি কথাতেই স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

You cannot copy content of this page