সঞ্জয় গান্ধির নির্দেশ মানেননি, ইন্দিরা সরকারের প্রশংসার গান গাইতেও অস্বীকার! নিষি’দ্ধ হয়েছিল কণ্ঠ, বন্ধ হয়েছিল গান সম্প্রচার! তবুও কীভাবে আবার নিজের জায়গা ফিরে পেলেন কিশোর কুমার? গল্পটা জানলে অবাক হবেন!

ভারতীয় সঙ্গীত জগতের ইতিহাসে কিশোর কুমার এমন এক নাম, যাঁর জনপ্রিয়তা সময়ের সীমানা ছাড়িয়ে আজও অটুট। প্রায় চার দশক আগে তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেও তাঁর গাওয়া অসংখ্য গান এখনও কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে একইভাবে বেঁচে আছে। শুধু কণ্ঠের জাদুই নয়, নিজের স্পষ্ট অবস্থান এবং স্বাধীনচেতা মানসিকতার জন্যও তিনি আলাদা পরিচিতি গড়ে তুলেছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত রসিক, তবে প্রয়োজনে নিজের মতের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতেও দ্বিধা করতেন না। তাঁর জন্মদিনে ফিরে দেখা যাক এমনই এক অধ্যায়, যেখানে ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধেও নিজের সিদ্ধান্ত থেকে একচুল নড়েননি তিনি।

ঘটনার শুরু ১৯৭৪ সালে। সেই সময় সঞ্জয় গান্ধির উদ্যোগে দিল্লিতে একটি সঙ্গীত অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। মুম্বইয়ের একাধিক জনপ্রিয় শিল্পীর সঙ্গে আমন্ত্রণ পান কিশোর কুমারও। কিন্তু তিনি কোনও গ্রহণযোগ্য কারণ না দেখিয়েই সেই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে অস্বীকার করেন। এই সিদ্ধান্তে সঞ্জয় গান্ধি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হন। পরে বিষয়টি ইন্দিরা গান্ধী সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রক পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এর পর থেকেই কিশোর কুমারকে ঘিরে সরকারের মনোভাব বদলাতে শুরু করে বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

এর কিছুদিন পর দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয়। সেই সময় ইন্দিরা গান্ধীর বিশ দফা কর্মসূচির প্রচারের দায়িত্ব দেওয়া হয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী বিদ্যা চরণ শুক্লকে। সরকারের পরিকল্পনা ছিল, দেশের জনপ্রিয় শিল্পীদের কণ্ঠে এই কর্মসূচির প্রচার করা হবে। সেই উদ্দেশ্যে তথ্য মন্ত্রকের কয়েকজন আধিকারিক কিশোর কুমারের সঙ্গে দেখা করতে মুম্বইয়ে যান। তাঁরা চান, কিশোর কুমার সরকারের কর্মসূচির প্রশংসায় গান গাইুন। কিন্তু তিনি সেই প্রস্তাবও স্পষ্টভাবে ফিরিয়ে দেন। সরকারের হয়ে প্রচারমূলক গান গাইতে তিনি রাজি হননি।

এই দুটি ঘটনার পর কিশোর কুমারের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়। অলিখিত নির্দেশের পর আনুষ্ঠানিকভাবে আদেশ জারি করে তাঁর সমস্ত গান আকাশবাণী এবং দূরদর্শনে সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়। দেশের সরকারি সম্প্রচার মাধ্যমে তাঁর কণ্ঠস্বর যেন শোনা না যায়, সেই নির্দেশ কার্যকর করা হয়। শুধু তাই নয়, যে সব ছবিতে তাঁর গান ছিল, সেগুলির শংসাপত্র পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। এমনকি তাঁর গাওয়া গানের গ্রামোফোন রেকর্ড বিক্রির ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় বলে জানা যায়। এক কথায়, তাঁর সঙ্গীতকে জনসমক্ষে পৌঁছনোর সব পথ বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা চলেছিল।

তবে এত বাধা সত্ত্বেও কিশোর কুমার নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি। তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন এবং কোনও চাপের কাছে মাথা নত করেননি। এই সময়েও তিনি গানের চর্চা এবং কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন। তাঁর জনপ্রিয়তাও কমেনি। বরং অসংখ্য অনুরাগী তাঁর পাশে ছিলেন। চলচ্চিত্র জগতের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বও এই নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করেন এবং বিষয়টি নিয়ে উচ্চপর্যায়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন। ধীরে ধীরে পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে থাকে।

আরও পড়ুনঃ “মা হতে চেয়েছিলাম…এক বছরেরও বেশি সময় হল আমরা আলাদা”, “কেউ বন্ধু হিসেবে ভালো হলেও, স্বামী হিসেবে…” ভালোবেসে বিয়ে করেও কেন ভাঙল, ‘বোঝে না সে বোঝে না’ খ্যাত দেবপর্ণা চক্রবর্তীর সংসার? স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পূরণ হয়নি প্রত্যাশা! পাঁচ বছরের দাম্পত্য ভাঙার কারণ জানিয়ে আবেগঘন অভিনেত্রী!

শেষ পর্যন্ত সেই অচলাবস্থার অবসান ঘটে। সরকারের সঙ্গে আলোচনার পর নিষেধাজ্ঞা উঠে যায় এবং আবারও স্বাভাবিকভাবে গান গাওয়ার সুযোগ পান কিশোর কুমার। আকাশবাণী, দূরদর্শন এবং চলচ্চিত্রে তাঁর কণ্ঠ আবারও ফিরে আসে। এরপর নতুন উদ্যমে তিনি সঙ্গীতজগতে নিজের সাফল্যের ধারা বজায় রাখেন। আজও এই ঘটনাকে অনেকেই একজন শিল্পীর স্বাধীন মত প্রকাশ এবং নিজের নীতিতে অটল থাকার বিরল উদাহরণ হিসেবে মনে করেন। কিশোর কুমারের এই অধ্যায় প্রমাণ করে, সাময়িক বাধা যত বড়ই হোক, প্রকৃত প্রতিভা এবং আত্মবিশ্বাসকে দীর্ঘদিন আটকে রাখা যায় না।

You cannot copy content of this page