বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে উত্তম কুমার শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেতা নন, তিনি বাঙালির অভিনয়-ভাবনারই একটি আলাদা অধ্যায়। তাঁর স্বাভাবিক অভিনয়, সংলাপ বলার নিজস্ব ভঙ্গি, চোখের অভিব্যক্তি এবং পর্দায় উপস্থিতি বাংলা সিনেমাকে নতুন মাত্রা দিয়েছিল। নায়ক হিসেবে তাঁর জনপ্রিয়তা যেমন ছিল তুঙ্গে, তেমনই সহ-অভিনেতাদের সঙ্গে কাজ করার ধরনেও ছিল আলাদা মাধুর্য। তাই এত বছর পরেও তাঁর অভিনয় এবং ব্যক্তিত্ব নিয়ে মানুষের আগ্রহ এতটুকু কমেনি।
মহানায়কের সঙ্গে কাজ করার সেই অভিজ্ঞতারই একটি অজানা অধ্যায় সামনে এনেছেন বর্ষীয়ান অভিনেতা বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়। উত্তমকুমারের সঙ্গে তাঁর প্রথম ছবি ছিল ‘নগর দর্পণে’। আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের গল্প অবলম্বনে দিলীপ মুখার্জি পরিচালিত সেই ছবিতে বিপ্লবের চরিত্র ছিল রতন নামে এক লাফাঙ্গা যুবকের। আর প্রথম দিনের শুটিংয়েই তাঁকে অভিনয় করতে হয়েছিল উত্তম কুমারের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকশন দৃশ্যে।
দীঘার সমুদ্রসৈকতে সেই দৃশ্যের শুটিং হওয়ার কথা ছিল। গল্প অনুযায়ী, রতন নায়িকাকে বিরক্ত করলে উত্তম কুমার তাঁকে ঘুষি মারবেন। এরপর রতন অপমানিত হয়ে উত্তম কুমারের কলার চেপে ধরবে এবং শুরু হবে তর্ক। নতুন অভিনেতা হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই উত্তম কুমারের কলার ধরার কথা ভেবে ভয় পেয়েছিলেন বিপ্লব। তাই শুটিংয়ের আগে তাঁর সঙ্গে একটু কথা বলে নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু পরিচালক তাঁকে জানান, নিজেকেই গিয়ে উত্তমকুমারের সঙ্গে কথা বলতে হবে।
শেষ পর্যন্ত উত্তম কুমারের কাছে গিয়ে নিজের পরিচয় দেন বিপ্লব। তাঁকে অবাক করে দিয়ে উত্তম কুমার আগের একটি সাক্ষাতের কথাও মনে রেখেছিলেন। এরপর পাশে বসতে বললে সংকোচে রাজি হচ্ছিলেন না বিপ্লব। তখন ধমক দিয়ে তাঁকে বসান মহানায়ক। তারপরই বলেন, “এখানে তুই বিপ্লব নোস, আমিও উত্তম কুমার নই। তাই অবশ্যই আমার কলার ধরবি। ভয় পাবি না।” মহানায়কের সেই কথাতেই ভয় কেটে যায় বিপ্লবের। আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়ে দৃশ্যটি এক টেকেই ভালোভাবে করে ফেলেন তিনি।
আরও পড়ুনঃ সবাইকে হাসিয়ে, মাতিয়ে রাখা নিরঞ্জন হঠাৎ ভেঙে পড়লেন ‘বিগ বস বাংলা’র ঘরে! ঝিলমকে জড়িয়ে কান্না, কীসের এত ভয় ‘লাফটারসেন’-এর?
শুটিংয়ের সময় চরিত্রের মধ্যে এতটাই ঢুকে গিয়েছিলেন বিপ্লব যে পরিচালক ‘কাট’ বলার পরেও উত্তম কুমারের কলার ধরে রেখেছিলেন। শেষে মহানায়ক নিজেই হালকা হেসে তাঁর কব্জিতে চাপড় মেরে হাত ছাড়ান। তারপর প্রশংসা করে বলেন, “খুব ভাল কাজ করেছিস। ভেরি গুড!” বিপ্লবের স্মৃতিতে এই ঘটনাই যেন পর্দার মহানায়কের আড়ালে থাকা এক অন্য উত্তম কুমারকে সামনে আনে যিনি নতুন অভিনেতাকে ভয় না পেয়ে নিজের মতো করে অভিনয় করার সাহস দিয়েছিলেন।






