২০০৯ সালে জি বাংলার জনপ্রিয় রিয়্যালিটি শো ‘দিদি নাম্বার ওয়ান’-এর যাত্রা শুরু হয়। অনুষ্ঠানটির প্রথম সঞ্চালিকার দায়িত্বে ছিলেন অভিনেত্রী পুষ্পিতা মুখোপাধ্যায়। সেই সময় স্টুডিয়োর বদলে বিভিন্ন পাড়া ও এলাকায় গিয়ে আয়োজন করা হতো এই গেম শো। তবে মাত্র একটি সিজন সঞ্চালনার পরই অনুষ্ঠান থেকে সরে দাঁড়ান তিনি। সে সময় শোনা গিয়েছিল, মায়ের অসুস্থতার কারণেই তাঁকে এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। যদিও পরবর্তী সময়ে একাধিকবার প্রতিযোগী হিসেবে ‘দিদি নাম্বার ওয়ান’-এর মঞ্চে দেখা গিয়েছে পুষ্পিতাকে। শুরু থেকেই সাধারণ মহিলাদের জীবনের লড়াই ও সাফল্যের গল্প তুলে ধরার কারণে অনুষ্ঠানটি দর্শকদের কাছে বিশেষ জনপ্রিয়তা পায়।
২০১০ সালে অনুষ্ঠানের দায়িত্ব আসে অভিনেত্রী রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে রচনা জানিয়েছেন, টেলিভিশনে নিয়মিত সঞ্চালনার কাজ নিয়ে শুরুতে তাঁর কিছুটা দ্বিধা ছিল। কারণ তখনও তিনি সিনেমায় নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করছিলেন এবং ছোটপর্দায় নিয়মিত উপস্থিতি নিয়ে সংশয়ে ছিলেন। তবে অনুষ্ঠানের নির্মাতারা তাঁর উপর ভরসা রেখেছিলেন। সেই বিশ্বাসই পরে সার্থক হয়। রচনার উপস্থাপনা, সহজ কথাবার্তা এবং প্রতিযোগীদের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক খুব দ্রুত দর্শকদের মন জয় করে নেয়। ধীরে ধীরে ‘দিদি নাম্বার ওয়ান’ এবং রচনা যেন একে অপরের সমার্থক হয়ে ওঠে।
তবে এই দীর্ঘ যাত্রাপথে একাধিকবার বদল হয়েছে অনুষ্ঠানের সঞ্চালক। রচনা দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় দু’বছর পর তৃতীয় সিজনে তাঁর জায়গায় দেখা যায় অভিনেত্রী জুন মালিয়াকে। সে সময় শোনা গিয়েছিল, সৃজনশীল প্রয়োজনের কারণেই এই পরিবর্তন আনা হয়েছিল। কিন্তু মাত্র একটি সিজনের মধ্যেই আবার রচনাকে ফিরিয়ে আনা হয়। এরপর পঞ্চম সিজনে আবারও পরিবর্তন আসে। ২০১৩ সালে অনুষ্ঠানের সঞ্চালিকার দায়িত্ব নেন অভিনেত্রী দেবশ্রী রায়। সে সময় পারিশ্রমিক সংক্রান্ত মতবিরোধের জল্পনা ছড়ালেও এই বিষয়ে রচনা, প্রযোজনা সংস্থা বা চ্যানেল কর্তৃপক্ষের তরফে কখনও কোনও আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করা হয়নি। দেবশ্রীর একটি সিজন শেষ হতেই ষষ্ঠ সিজনে ফের ফিরে আসেন রচনা।
এরপর দীর্ঘ সময় ধরে একটানা অনুষ্ঠানটির মুখ হয়ে থাকেন রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়। মাঝেমধ্যে বিশেষ পরিস্থিতিতে অন্যদের সঞ্চালনার দায়িত্ব নিতে দেখা গেলেও মূল দায়িত্ব ছিল তাঁর হাতেই। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে এসেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই পর্বে তাঁকে রুটি বেলতেও দেখা যায়। একই বছরে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে লড়ে সাংসদ হন রচনা। তারপর থেকেই প্রশ্ন উঠতে থাকে, তিনি কি রাজনীতি ও সঞ্চালনার কাজ একসঙ্গে চালিয়ে যেতে পারবেন? যদিও গত দুই বছর ধরে তিনি দুই দায়িত্বই সামলেছেন। এদিকে ২০২৫ সালের নভেম্বরে একটি প্রোমোয় সঞ্চালকের ভূমিকায় দেখা যায় মীরকে। তিনি তিনটি পর্ব পরিচালনা করেন। তখন অনেকেই ভেবেছিলেন রচনার পরিবর্তে নতুন মুখ আনা হচ্ছে। পরে জানা যায়, বিদেশ সফরে থাকার কারণেই কয়েকদিনের জন্য এই পরিবর্তন হয়েছিল।
সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর আবারও অনিশ্চয়তা তৈরি হয় ‘দিদি নাম্বার ওয়ান’-এর সঞ্চালনা নিয়ে। কয়েকটি পর্বে দায়িত্ব সামলাতে দেখা যায় জনপ্রিয় জুটি শ্বেতা ভট্টাচার্য ও রুবেল দাসকে। তৃণমূলের খারাপ ফলাফলের পর এই পরিবর্তন নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়। তবে সেই সময় শ্বেতা স্পষ্ট বলেছিলেন, “রচনাদি থাকবেন না, এটা হতে পারে না। কারণ, দিদির হাত ধরেই এই শোয়ের জনপ্রিয়তা।” পরে জানা যায়, ব্যক্তিগত কারণে কয়েকদিনের ছুটিতে ছিলেন রচনা। যদিও সেই সময় তাঁকে দিল্লিতে দেখা গিয়েছিল। অন্যদিকে রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আলোচনার মাঝেই রচনা বলেছিলেন, “দিদির সঙ্গে আমার পুরনো সম্পর্ক। সেই সম্পর্ক অটুট থাকবে। সবাই বলেন, দিদি মানেই তৃণমূল। ঠিকই। তাঁকে দেখেই মানুষ ভোট দেন। কিন্তু আমাকে চিত্রতারকা বলে নয়, মানুষ আমাকে ভোট দিয়েছেন কাজ করার জন্য, যে কাজ গত ১৫ বছরে হয়নি। কাজ করার জন্য কেন্দ্রের সমর্থন দরকার। সেটা খুব জরুরি।”
আরও পড়ুনঃ টিআরপি তালিকায় ফের আধিপত্য জি বাংলার! শীর্ষে যৌথভাবে দাপট দুই ধারাবাহিকের! হারানো গৌরব ফিরে পেল ‘পরিণীতা’! চমক দেখাল ‘জোয়ার ভাঁটা’, ‘পরশুরাম’ ও ‘বিদ্যা ব্যানার্জি’র জায়গা কোথায়? জেনে নিন, এই সপ্তাহের সেরা পাঁচে জায়গা পেল কারা?
এবার অবশ্য পরিস্থিতি আরও নাটকীয় মোড় নিয়েছে। ইতিমধ্যেই জানা গিয়েছে, ‘দিদি নাম্বার ওয়ান’-এর নতুন সঞ্চালিকা হিসেবে দায়িত্ব নিতে চলেছেন স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়। প্রকাশ্যে এসেছে তাঁর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানের নতুন প্রোমোও। এই পরিবর্তন নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে রচনা বলেন, “এটা ওদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। ওদের প্রমাণ করে দেখাতে হবে, রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বদলি যে কেউ হতে পারে। সেটা করে দেখাক ওরা। আমি সেই দিনটাই দেখার অপেক্ষায় আছি। সঞ্চালিকা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত ওরা নিয়েছিল। আমি আমার সবটুকু দিয়ে এই অনুষ্ঠান করেছি।” একইসঙ্গে স্বস্তিকার প্রতি শুভেচ্ছাও জানিয়েছেন তিনি। রচনার কথায়, “স্বস্তিকা আমার খুব ভাল সহকর্মী। বহু দিনের সম্পর্ক আমাদের। নিশ্চয়ই খুব ভাল কাজ করবে। অনেক শুভেচ্ছা। আশা করছি, মানুষও ওকে খুব ভাল ভাবে গ্রহণ করবে। আমি চাই, এই অনুষ্ঠান একই ভাবে জনপ্রিয়তা পাক, সফল হোক।” ১৭ বছরের ইতিহাস বলছে, রচনা যখনই অনুষ্ঠান থেকে সরে গিয়েছেন, তার প্রভাব পড়েছে টিআরপিতে এবং পরে তাঁকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এবারও কি সেই একই ঘটনা ঘটবে, নাকি স্থায়ীভাবে নতুন অধ্যায় শুরু হবে, সেটাই এখন দেখার।






