যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি ঘিরে উত্তাপ এখনও পুরোপুরি কমেনি। গত বুধবার রাতে এসএফআই এবং অন্য বাম ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে এবিভিপির সংঘর্ষের পর থেকেই ক্যাম্পাসে তৈরি হয়েছে অশান্তির পরিবেশ। তার পরের দিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকার চেষ্টা করেন একদল বহিরাগত, যাঁদের হাতে এবিভিপির পতাকা ছিল বলে অভিযোগ। মূল ফটক বন্ধ থাকায় তাঁরা সেটি টপকে ঢোকার চেষ্টা করেন। সেই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী প্রতীকের উপর পা দেওয়ার অভিযোগও ওঠে। এর জেরে প্রতীকের ভিতরের গোলাকার ধাতব অংশ ভেঙে পড়ে। এই ঘটনায় বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির তরফে বহিরাগতদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ে এবার মুখ খুললেন যাদবপুরের একাধিক তারকা প্রাক্তনী।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রাক্তন ছাত্র গায়ক ও গীতিকার অনুপম রায় এই ঘটনায় নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। তাঁর বক্তব্য, যে পরিস্থিতিই তৈরি হোক, তিনি সবসময় পড়ুয়াদের পাশে থাকবেন। তাঁর কথায়, “আমি নিজেও তো একসময় ছাত্র ছিলাম। তাই জানি, ছাত্রাবস্থার আবেগ খাঁটি হয়। আমি সব সময়ে ছাত্রদের পক্ষেই।” অনুপম মনে করেন, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার কারণেই যাদবপুরের পড়ুয়ারা সরকারকে প্রশ্ন করার অধিকার নিয়ে সরব হন। তাঁর মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারের কাছে প্রশ্ন তোলা স্বাভাবিক। তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় সাধারণ মানুষের করের টাকায় চলে, তাই পড়ুয়াদের প্রশ্ন করার অধিকার রয়েছে। একই সঙ্গে এত বছরের ঐতিহ্যকে সম্মান না করার ঘটনাতেও তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
যাদবপুরের তুলনামূলক সাহিত্যের প্রাক্তনী গায়ক অনিন্দ্য বসুও বর্তমান পরিস্থিতিতে যথেষ্ট বিরক্ত। তাঁর মতে, সারা বিশ্বে মেধা এবং রাজনৈতিক সচেতনতার জন্য পরিচিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন ঘটনা একেবারেই কাম্য নয়। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়টি বরাবরই রাজনৈতিক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত হলেও এই ধরনের সংঘর্ষ বা ভাঙচুরের ঘটনা অনভিপ্রেত। তবে প্রতীকটি ঠিক কারা ভেঙেছেন, সেই বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন। তাঁর বক্তব্য, সাধারণ মানুষের পক্ষে ঘটনাটির প্রকৃত সত্য বোঝা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, দেশের বাইরে থাকা নাট্যকার এবং যাদবপুরের তুলনামূলক সাহিত্যের প্রাক্তনী সুমন মুখোপাধ্যায়ও পড়ুয়া ও শিক্ষকদের পাশে থাকার কথা জানিয়েছেন। তাঁর কথায়, “যাদবপুরে যা হচ্ছে, তা অত্যন্ত খারাপ এবং নিন্দনীয়।” ক্যাম্পাসে শান্তি ফেরানোর উদ্যোগকেও তাই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী অভিনেত্রী উষসী চক্রবর্তীও ঐতিহ্যবাহী প্রতীক ভেঙে যাওয়ার ঘটনায় নিজের ক্ষোভ জানিয়েছেন। তাঁর কথায়, এই প্রতীক রক্ষা করা প্রতিটি পড়ুয়ার দায়িত্ব। রাজনৈতিক মতাদর্শ আলাদা হলেও যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়কে ভালোবাসেন, তাঁরা কীভাবে এমন ক্ষতি করতে পারেন, তা তাঁর কাছে বোধগম্য নয়। একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগঠন কার হাতে থাকবে, তা মারামারি দিয়ে নয়, নিয়ম মেনে পরীক্ষা বা নির্বাচনের মাধ্যমে ঠিক হওয়া উচিত। তাঁর বক্তব্য, ক্যাম্পাসে সংঘর্ষের পরিবেশ কোনওভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি। দ্রুত পড়াশোনার উপযুক্ত পরিবেশ ফিরিয়ে আনার আবেদন জানিয়েছেন এই অভিনেত্রী।
অন্যদিকে, ২০২৩ সালে যাদবপুরের হস্টেলে প্রথম বর্ষের এক ছাত্রের মৃত্যুর পর সিসিটিভি বসানো নিয়ে যে বিতর্ক হয়েছিল, সেই প্রসঙ্গও বর্তমান ঘটনায় উঠে এসেছে। তুলনামূলক সাহিত্যের প্রাক্তনী ঋতব্রত মুখোপাধ্যায় এই বিষয়টি টেনে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, যাঁরা একসময় সিসিটিভি বসানোর দাবিতে সরব হয়েছিলেন, তাঁদেরই কয়েকজনকে এবার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অথচ তাঁদের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ করা হয়নি বলে তিনি দাবি করেন। তিনি সমাজমাধ্যমে ক্যাম্পাসে কী বলা বা কীভাবে চলা উচিত সেই পরামর্শ দেওয়া ‘সুশীল সমাজের’ নীরবতা নিয়েও কটাক্ষ করেছেন। ব্যঙ্গের সুরে তিনি বলেন, এই পরিস্থিতিতে ভয়কে সরিয়ে ভরসা ফিরিয়ে আনার কথা বলা হলেও বাস্তবে ক্যাম্পাসে নিরাপত্তার বদলে ভয়ই জায়গা করে নিয়েছে।
অভিনেত্রী শোলাঙ্কি রায়, যাদবপুরের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রাক্তনী, গোটা ঘটনাকে ‘গুন্ডামি’ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর অভিযোগ, যে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের নিজেদের মতো করে ভাবার ক্ষমতা রয়েছে, সেই ক্ষমতাকে চেপে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাঁর দাবি, সরকার প্রশ্নহীন এবং অনুগত মানুষ চায়, আর কেউ প্রশ্ন করলেই তাকে সমস্যার কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এমনকি ইচ্ছাকৃতভাবে ভাঙচুর করে পুলিশ মোতায়েনের পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। অন্যদিকে দর্শনের প্রাক্তনী অভিনেত্রী মধুমিতা সরকার সাধারণত রাজনৈতিক বিতর্ক থেকে নিজেকে দূরে রাখলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে পড়ুয়াদের উপর আক্রমণ মেনে নিতে পারছেন না। তাঁর মতে, যাদবপুর রাজনৈতিক ভাবে সক্রিয় হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত পড়াশোনা। এই পরিস্থিতিতে দ্রুত শান্তি ফিরুক, এমনটাই চাইছেন একাধিক প্রাক্তনী।
আরও পড়ুনঃ “ছেলের কাছ থেকেই…ও আমাকে উল্টে বকে ‘তুমি কেন করোনি?’” মনোময় ভট্টাচার্যের এই স্বীকারোক্তির নেপথ্যে কি শুধুই বদলে যাওয়া প্রজন্মের গল্প? জেনারেশন গ্যাপ কি সত্যিই দূরত্ব তৈরি করেছে, নাকি সেই ফারাকই বন্ধুর মতো করে দিয়েছে বাবা-ছেলের সম্পর্ককে? চেনেন গায়কের ছেলেকে?
বর্তমানে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি কিছুটা স্তিমিত হলেও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। ক্যাম্পাসে শান্তি ফেরানোর উদ্দেশ্যে সোমবার সব পক্ষকে নিয়ে বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল। তবে সেই বৈঠকে এবিভিপি উপস্থিত ছিল না। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীক ভাঙচুরের ঘটনায় পুলিশে অভিযোগও করা হয়েছে বামপন্থী পড়ুয়াদের তরফে। কে বা কারা প্রতীকের ক্ষতি করেছে এবং ঘটনার নেপথ্যে ঠিক কী হয়েছিল, তা নিয়ে এখনও চাপানউতোর চলছে। এমন পরিস্থিতিতে যাদবপুরের একাধিক প্রাক্তনীই পড়াশোনার পরিবেশ দ্রুত ফিরিয়ে আনার পক্ষে মত দিয়েছেন। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও ক্যাম্পাসে সংঘর্ষ ও ভাঙচুর যেন আর না হয়, সেই বার্তাই উঠে এসেছে তাঁদের বক্তব্যে। এখন নজর, কবে ফের সম্পূর্ণ শান্ত পরিবেশে ফিরবে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়।






