“দই এনেছ?” আজও কানে বাজে সেই ডাক! অভিনয়ে আসার কোনও পরিকল্পনাই ছিল না তাঁর, বাবা-মা কেউই চাননি! কীভাবে মৃণাল সেন তাঁকে গড়ে তুললেন জাত অভিনেত্রী? কিংবদন্তি পরিচালকের ১০৩তম জন্মবার্ষিকীতে আবেগে স্মৃতিমেদুর মমতা শঙ্কর, শোনালেন অজানা সব গল্প?

মৃণাল সেনের ১০৩তম জন্মবার্ষিকীতে আবেগঘন স্মৃতিচারণ করলেন অভিনেত্রী মমতা শঙ্কর। ‘মৃগয়া’, ‘ওকা উরি কথা’, ‘একদিন প্রতিদিন’ ও ‘খারিজ’ সহ একাধিক ছবিতে কাজ করেছিলেন তিনি। সেই অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে মমতা জানান, “আজকের দিনটা আমার কাছে সত্যিই বড়। মৃণালদার জন্মদিন।” তিনি বলেন, পরিবার থেকে যেমন আশীর্বাদ পেয়েছেন, তেমনই সিনেমার জগতে মৃণাল সেনের হাত ধরেই তাঁর পথচলা শুরু। মমতার কথায়, “ওঁর জন্যই এই জগতে আসা।” শুধু পরিচালক নন, মৃণাল সেন ও তাঁর স্ত্রী দু’জনের কাছ থেকেই তিনি স্নেহ ও ভালবাসা পেয়েছিলেন। আজও তাঁদের অনুপস্থিতি তিনি মেনে নিতে পারেন না বলে জানান।

মমতা শঙ্কর বলেন, অভিনয়ে আসার কোনও পরিকল্পনাই তাঁর ছিল না। বাবা মা কেউই চাননি, তিনিও নিজে চাননি। তবে পারিবারিক সম্পর্কের সূত্রে মৃণাল সেনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছিল। তিনি বারবার চাইতেন মমতা অভিনয় করুন। একদিন মৃণাল সেন তাঁকে বলেছিলেন, “কোনও দিন যদি অভিনয় করার ইচ্ছে হয়, খবরটা আমাকে প্রথম দিয়ো।” মমতাও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, অভিনয় করলে প্রথম কাজ হবে তাঁর ছবিতেই। কলেজে পড়ার সময় কিছুটা অবসর পেয়ে তিনি ফোন করে বলেন, “আমার এখন অনেকটা সময় আছে মৃণালদা। এখন পড়ার চাপ নেই। এখন অভিনয়ের সুযোগ থাকলে আমি রাজি আছি।” সেই ফোনকলের পরই শুরু হয় তাঁর অভিনয়জীবন।

প্রসঙ্গত, ‘মৃগয়া’ ছবির কাজ শুরুর আগেই মৃণাল সেনের কঠোর নির্দেশের কথা জানান মমতা। তিনি বলেন, “ভুরু প্লাক করা চলবে না” এবং “চুল কাটা চলবে না।” চরিত্রটি সাঁওতাল হওয়ায় তাঁকে গায়ের রং কালো করতে বলা হয়েছিল। প্রথমে প্রসাধনীর সাহায্যে রং করা হলেও তা তাঁর ভাল লাগেনি। তখন তিনি অনুরোধ করেন, “আমি প্রসাধনীর মাধ্যমে গায়ে কালো রং করব না। রোদে পুড়ে গায়ের রং চাপাব?” উত্তরে পরিচালক জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তুমি পারবে?” মমতা বলেন, তিনি মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত রোদের মধ্যে থেকেছেন, শুটিং চলাকালীনও সূর্য ডোবা পর্যন্ত বাইরে থাকতেন।

‘ওকা উরি কথা’ ছবির জন্যও তাঁকে গায়ের রং শ্যামলা করতে হয়েছিল। সেই সঙ্গে নির্দেশ ছিল, “খালি পায়ে হাঁটাচলা করা অভ্যাস করো।” হায়দরাবাদের গরম রাস্তা, পাথর আর কাঁটার মধ্যেও তিনি অনুশীলন করেছিলেন। অন্য কয়েকটি ছবির প্রসঙ্গেও নানা স্মৃতি ভাগ করে নেন অভিনেত্রী। তিনি জানান, ‘আকালের সন্ধানে’ ছবিতে তাঁকে নেওয়ার ইচ্ছে ছিল পরিচালকের, কিন্তু তখন তিনি দীনেন গুপ্তের ‘কলঙ্কিনী’ ছবিতে ব্যস্ত থাকায় সময় দিতে পারেননি। পরে সেই চরিত্রে অভিনয় করেন স্মিতা পাটিল। মমতার কথায়, “অসম্ভব ভাল অভিনয় করেছিলেন স্মিতা। জানি না, ওঁর মতো ভাল পারতাম কি না।”

‘একদিন প্রতিদিন’ ছবির মূল চরিত্রও প্রথমে তাঁর জন্য ভাবা হয়েছিল। কিন্তু তখন তাঁর বড় ছেলের বয়স মাত্র ১৭ দিন হওয়ায় দীর্ঘ শুটিং সম্ভব ছিল না। তিনি অনুরোধ করেন, “কোনও ছোট চরিত্র রয়েছে? অল্প দিন শুটিং করেই যাতে কাজটা হয়ে যায়!” এরপর তাঁকে চিনুর চরিত্রে নেওয়া হয়। মমতা বলেন, আর একবার ‘না’ বলতে তিনি চাননি। ‘খারিজ’ ছবির অভিজ্ঞতাও তাঁর কাছে বিশেষ স্মরণীয়। তিনি জানান, ছবিটি ভাল ব্যবসা করেছিল এবং নির্ধারিত পারিশ্রমিক দেওয়ার পরও মৃণাল সেন আলাদা করে একটি চেক পাঠিয়েছিলেন। সেই চেক তিনি আজও ভাঙাননি।

আরও পড়ুনঃ “অভিষেক উঠে এসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সাইড করে দিল, পুরোটাই ‘ওয়ান মেন শো’ ছিল!” “তৃণমূল সরে গেল, লড়াই এবার বাম ও বিজেপির” ১৫ বছর পর রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তন নিয়ে মন্তব্য, বামপন্থী অভিনেত্রী মানসী সিনহার! প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে দিলেন, মানসিক চিকিৎসার পরামর্শও!

মমতার কথায়, পরিচালকের সততা ও নিজের বিশ্বাসে অটল থাকার মানসিকতা তাঁকে আজও অনুপ্রাণিত করে। তিনি বলেন, “যেটা ঠিক, তার পক্ষে ছিলেন।” বর্তমান সময় নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে মমতা জানান, মৃণাল সেন আজ বেঁচে থাকলে রাজ্যের পরিবর্তনে খুশি হতেন বলেই তাঁর বিশ্বাস। শেষে আবেগ নিয়ে বলেন, জন্মদিনে তিনি নিয়ম করে দই নিয়ে যেতেন। দরজা খুলেই পরিচালক বলতেন, “দই এনেছ?” আবার রাত ১১টায় ফোন করলে বলতেন, “বেঁচে আছি। এখনও মরিনি।” আজও মনে হয়, ফোন করলেই সেই দৃপ্ত কণ্ঠস্বর শোনা যাবে।

You cannot copy content of this page