‘সপ্তম শ্রেণিতে অঙ্ক শেখাতে গিয়ে দাদা আমাকে জোর করে…কাউকে কিছু বলতে পারিনি’, ‘প্রেমিকের বিয়ের খবরও পেয়েছি কয়েকদিন আগে’ ছেড়েছেন পরিবার, দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে জীবনে একের পর এক প্রিয় মানুষের কাছে ভয়ংকর অভিজ্ঞতার শিকার ‘লাফটারসেন’ ওরফে নিরঞ্জন মণ্ডল ! শৈশবের কোন ক্ষ’ত থেকেই বিগ বস বাংলার ঘরে মাঝেমধ্যেই অতিরিক্ত আবেগী হয়ে পড়েন তিনি?

সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘লাফটারসেন’ নামে পরিচিত নিরঞ্জন মণ্ডল এখন বাংলার অন্যতম পরিচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর। নিজের অভিনয়, রসবোধ এবং সাধারণ জীবনের নানা ঘটনা থেকে গল্প তৈরি করে ইতিমধ্যেই দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। তবে এবার হাসির ভিডিওর গণ্ডি পেরিয়ে একেবারে অন্য ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে তাঁকে। বর্তমানে ‘বিগ বস বাংলা ২০২৬’-এর ঘরে রয়েছেন নিরঞ্জন। সেখানে তাঁর ব্যক্তিত্বের আরও নানা দিক সামনে আসছে। তবে কয়েক মাস আগে এক অনুষ্ঠানে নিজের জীবনের এমন কিছু অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছিলেন তিনি, যা তাঁর হাসিখুশি পর্দার আড়ালে থাকা কঠিন লড়াইয়ের কথা সামনে এনেছিল। ছোটবেলায় নিজের যৌন পরিচয় সম্পর্কে কিছুই জানতেন না নিরঞ্জন।

ষষ্ঠ বা সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় অঙ্ক শেখার জন্য পাশের বাড়ির এক যুবকের কাছে যেতেন তিনি। নিরঞ্জনের কথায়, সেই সুযোগের অপব্যবহার করে ওই যুবক তাঁর সঙ্গে জোর করে শারীরিক সম্পর্ক করার চেষ্টা করতেন। বয়স কম থাকায় তখন ঠিক কী ঘটছে, তা বুঝতে পারেননি তিনি। শুধু মনে হয়েছিল, বিষয়টি ঠিক নয়। ভয় এবং পরিবারের পরিস্থিতির কারণে কাউকে কিছু বলতেও পারেননি। পরবর্তীতে স্কুলজীবনে ধীরে ধীরে নিজের আকর্ষণ ও যৌন পরিচয় সম্পর্কে বুঝতে শুরু করেন নিরঞ্জন। তিনি জানান, মেয়ে নয়, ছেলেদের প্রতিই তাঁর আকর্ষণ বেশি অনুভূত হতে থাকে। এরপর মাধ্যমিকের পর তাঁর পরিবারেও তৈরি হয় নানা সমস্যা।

বাবা-মায়ের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকায় নিজের কথা বলার মতো কাউকে খুঁজছিলেন নিরঞ্জন। সেই সময় এক যুবকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। ওই যুবক নিজেকে উভকামী বলে জানিয়েছিলেন এবং ধীরে ধীরে তাঁদের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হয়। কিন্তু সম্পর্কের কয়েক বছর পর হঠাৎ জানতে পারেন, মাত্র সপ্তাহখানেক বা দশ দিনের মধ্যেই তাঁর প্রেমিকের বিয়ে। আগে থেকে তাঁকে কিছুই জানানো হয়নি। প্রথমে ধাক্কা খেলেও পরে তিনি পরিস্থিতিটা মেনে নেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, পরিবারের চাপ, বাবা-মায়ের দায়িত্ব এবং সমাজের ভয় অনেক সময় একজন মানুষকে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। এই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি বুঝতে পারেন,

যৌন পরিচয় লুকিয়ে রেখে জোর করে বিয়ে করলে শুধু একজন নয়, একাধিক মানুষের জীবন জটিল হয়ে যেতে পারে। নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই সমাজকে কিছু বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন নিরঞ্জন। প্রথম দিকে একটি ভিডিওতে উভকামী মানুষের পরিস্থিতি নিয়ে সামাজিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেন। সেই ভিডিও প্রথমে সেভাবে সাড়া না পেলেও বন্ধুরা তাঁকে উৎসাহ দেন। এরপর নিয়মিত ভিডিও তৈরি শুরু করেন তিনি। কিন্তু এখানেও বাধা আসে পরিবার থেকে। নিজের যৌন পরিচয় পরিবারে জানাজানি হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। ভিডিওতে কখনও শাড়ি বা লিপস্টিক পরে মহিলা চরিত্রে অভিনয় করলেও আত্মীয়দের নানা প্রশ্নের মুখে পড়তে হত তাঁর বাবা-মাকে।

শেষ পর্যন্ত বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র থাকতে শুরু করেন নিরঞ্জন। সেই সময় তাঁর কনটেন্ট তৈরিও প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পরে ময়ন নামে এক মেকআপ আর্টিস্টের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। সম্পর্ক তৈরি হওয়ার পর ময়ন তাঁকে নিজের পছন্দের কাজ চালিয়ে যাওয়ার উৎসাহ দেন। এরপর ফের ভিডিও বানানো শুরু করেন নিরঞ্জন এবং ধীরে ধীরে তাঁর কনটেন্ট ভাইরাল হতে থাকে। আজকের লাফটারসেনের কনটেন্টের পিছনেও রয়েছে তাঁর জীবনের নানা পর্যবেক্ষণ। বাড়ির মানুষ, পরিচিত চরিত্র, আশপাশের ছোট ছোট ঘটনা সবকিছু থেকেই ভিডিওর বিষয় খুঁজে নেন তিনি।

আরও পড়ুনঃ মৃণাল সেনের ‘ইন্টারভিউ’ থেকে অঞ্জন চৌধুরীর ‘শত্রু’ ও সত্যজিৎ রায়ের ‘শাখাপ্রশাখা’, নায়ক থেকে চরিত্রাভিনেতা হয়েই পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে বাঙালির মনে রাজত্ব করে চলেছেন রঞ্জিত মল্লিক! কখনও কঠোর ন্যায়পরায়ণ পুলিশ তো আবার ‘স্বয়ংসিদ্ধা’য় মানসিক ভারসাম্যহীন, সময় বদলেছে কিন্তু তাঁর স্বতন্ত্র উপস্থিতি আজও দর্শকের কাছে একই রকম! জন্মদিনে ফিরে দেখা অভিনেতার জীবনের জানা, অজানা গল্প!

তাঁর মতে, কনটেন্ট তৈরির জন্য সবসময় বড় কোনও ঘটনা প্রয়োজন নেই, চারপাশের মানুষকে লক্ষ্য করলেই গল্প পাওয়া যায়। পাশাপাশি নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও দিয়েছেন ‘সমাজ কী বলবে’ এই ভয়কে জীবনের সিদ্ধান্তের চেয়ে বড় করে দেখা উচিত নয়। নিজের পরিচয়কে বোঝা, পরিবারকে বোঝানো এবং ধীরে ধীরে সমাজের মানসিকতা বদলানোর চেষ্টা করাই জরুরি। আজ সেই নিরঞ্জনই ‘বিগ বস বাংলা’-র ঘরে নিজের বাস্তব ব্যক্তিত্ব নিয়ে দর্শকের সামনে রয়েছেন।

You cannot copy content of this page