“আমার সঙ্গে আর দেখা করতে পারবে না, মেয়েরা তো আমাকে তালা দিয়ে চলে যায়” কাঁপা কন্ঠে বলেছিলেন মান্না দে! বাংলা গানকে চেনা গণ্ডির বাইরে নিয়ে যাওয়াই ছিল যার লক্ষ্য, শেষ বয়সে নির্মম পরিণতি! “একটাই আফসোস রয়ে যাবে আমার”, শিল্পীর জন্মদিনে আবেগে ভাসলেন হৈমন্তী শুক্লা! কী না করতে পারার আক্ষেপ আজও তাড়া করে তাঁকে?

১ মে মানেই সংগীতপ্রেমীদের কাছে বিশেষ দিন, কারণ এই দিনেই জন্মেছিলেন কিংবদন্তি শিল্পী মান্না দে। তাঁর জন্মদিনে বহু পুরনো স্মৃতি মনে করলেন বর্ষীয়ান গায়িকা হৈমন্তী শুক্লা। তিনি জানান, মান্না দে শুধু বড় শিল্পীই ছিলেন না, মানুষ হিসেবেও ছিলেন অসাধারণ। প্রথম পরিচয়ের সেই দিন থেকে শুরু করে দীর্ঘ কাজের সম্পর্ক আজও তাঁর মনে স্পষ্ট। হৈমন্তীর কথায়, সময় যত গিয়েছে, ততই তিনি কাছ থেকে চিনেছেন মানুষটিকে। একজন গুরু, অভিভাবক আর স্নেহময় মানুষ হিসেবে মান্না দে-কে দেখেছেন তিনি। তাঁর চলে যাওয়ার এত বছর পরেও স্মৃতি যেন একটুও ফিকে হয়নি।

জন্মদিনে তাই আবেগঘন স্মৃতিচারণায় ফিরে এল বহু অজানা গল্প। ১৯৭৮ সালে প্রথমবার ভালোভাবে আলাপ হয়েছিল মান্না দে-র সঙ্গে। তার আগে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখা হলেও ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল না। গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ই তাঁদের আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় করিয়ে দেন। সালকিয়ার একটি অনুষ্ঠানে গান গাইছিলেন হৈমন্তী, সেই সময় হঠাৎ উপস্থিত হন মান্না দে। তাঁকে সামনে দেখে এতটাই নার্ভাস হয়ে পড়েছিলেন যে গান থামিয়ে দেন। পরে মান্না দে নিজেই তাঁকে স্বাভাবিক হতে সাহায্য করেন।

সেই প্রথম কথোপকথনের পর থেকেই শুরু হয় এক সুন্দর সম্পর্ক। পরবর্তীতে সেই পরিচয়ই রূপ নেয় কাজের গভীর বন্ধনে। হৈমন্তী শুক্লা জানান, মান্না দে-র সঙ্গে গান গাওয়া ছিল তাঁর বহুদিনের স্বপ্ন। পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় সেই ইচ্ছের কথা মান্না দে-কে জানান। তারপর এক পুজোয় মান্না দে-র সুরে চারটি গান রেকর্ড করার সুযোগ পান তিনি। সেই সময় পুজোর গান মানেই ছিল বিরাট সম্মানের বিষয়। এই সুযোগ পেয়ে তিনি ভীষণ আনন্দিত ও আবেগপ্রবণ হয়েছিলেন। সেই গানগুলির মধ্যে একটি বিশেষ জনপ্রিয়তাও পেয়েছিল। এরপর থেকে নিয়মিত যোগাযোগ বাড়তে থাকে তাঁদের মধ্যে।

মান্না দে কলকাতায় এলেই সুযোগ পেলেই তাঁর কাছে যেতেন হৈমন্তী। মান্না দে সম্পর্কে অনেকের ধারণা ছিল তিনি খুব রাগী মানুষ। কিন্তু হৈমন্তীর অভিজ্ঞতা ছিল একেবারেই উল্টো। তিনি বলেন, মান্না দে ছিলেন অত্যন্ত প্রাণবন্ত, আড্ডাপ্রিয় এবং সহজ মানুষ। গান শেখাতে বসে কখন যে গল্পে দুপুর গড়িয়ে যেত, টেরই পাওয়া যেত না। হিন্দি শেখার গুরুত্ব নিয়েও তিনি প্রায়ই পরামর্শ দিতেন। শিল্পীদের আরও বড় পরিসরে পৌঁছনোর কথা ভাবতেন সবসময়। তাঁর স্ত্রীকেও খুব শিক্ষিত, মার্জিত এবং আন্তরিক মানুষ বলে মনে রেখেছেন হৈমন্তী।

এই পরিবার থেকে তিনি পেয়েছিলেন অনেক স্নেহ ও সম্মান। অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেও মান্না দে সবসময় পাশে দাঁড়াতেন বলে জানান হৈমন্তী। অনেক আয়োজক তাঁর কাছে অনুষ্ঠান করার অনুরোধ নিয়ে আসতেন। সেই সময় মান্না দে জিজ্ঞেস করতেন আর কাদের রাখা হচ্ছে। প্রায়ই তিনি বলতেন, হৈমন্তীকেও নিতে হবে অনুষ্ঠানে। মজার ছলে বলতেন, আগে হৈমন্তী গান গাইলে তাঁর মেজাজ ভালো থাকে। সহশিল্পীদের নিয়ে এমন আন্তরিকতা খুব কম মানুষের মধ্যেই দেখা যায়। যেখানেই যেতেন, সবার খাওয়া-দাওয়া থেকে আরাম পর্যন্ত খেয়াল রাখতেন।

আরও পড়ুনঃ পর্দার প্রেম কি এবার বাস্তবেও? ‘বিদ্যা ব্যানার্জি’র অর্ণব-স্বস্তিকার ঘনি’ষ্ঠতা ঘিরে টলিপাড়ায় জোর চর্চা! সোশ্যাল মিডিয়ার মিষ্টি মুহূর্তেই কি লুকিয়ে দর্শকদের জন্য বড় ইঙ্গিত? অবশেষে জল্পনার জবাবে কী বললেন জুটি?

হৈমন্তীর মতে, তিনি ছিলেন সত্যিকারের অভিভাবকের মতো একজন মানুষ। তবে এত সুন্দর স্মৃতির মাঝেও একটি আক্ষেপ আজও থেকে গেছে। ২০১৩ সালে দুর্গাপুজোর সময় বেঙ্গালুরু গিয়েছিলেন হৈমন্তী শুক্লা। সেই সময় মান্না দে-র সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা ছিল তাঁর। ফোন করে ঠিকানাও জানতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু মান্না দে মজার সুরেই জানিয়েছিলেন, দেখা করা হয়তো সম্ভব হবে না। কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁর মৃত্যুসংবাদ পৌঁছে যায়। শেষবার দেখা না হওয়ার কষ্ট আজও বয়ে বেড়ান হৈমন্তী। মান্না দে-র জন্মদিনে সেই অপূর্ণতাই আবার ফিরে এল স্মৃতির সঙ্গে।

You cannot copy content of this page