‘বিগ বস বাংলা’র ঘরে প্রবেশের পর থেকেই সৃজলা গুহকে নিয়ে দর্শকদের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়েছিল। পর্দায় আত্মবিশ্বাসী এবং প্রাণবন্ত অভিনেত্রী হিসেবেই তাঁকে এতদিন দেখে এসেছেন দর্শক। কিন্তু তাঁর জীবনের শুরুর দিকের লড়াইয়ের কথা অনেকেরই অজানা ছিল। গতকাল ‘বিগ বস বাংলা’র গ্র্যান্ড ওপেনিংয়ের মঞ্চে নিজের সেই কঠিন সময়ের কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন সৃজলা। খুব অল্প বয়সেই তাঁকে জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। যে বয়সে বেশিরভাগ ছেলেমেয়ে বাবা মায়ের সঙ্গে থেকে ধীরে ধীরে ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার চেষ্টা করে, সেই বয়সেই নিজের পথ নিজেকেই খুঁজে নিতে হয়েছিল তাঁকে। বাবা মায়ের ছত্রছায়া ছাড়াই শুরু হয়েছিল তাঁর জীবনের অন্যরকম লড়াই।
সৃজলা জানিয়েছেন, তাঁর জন্ম মেক্সিকোয়। পরে বাবা মায়ের সঙ্গে তিনি উত্তরবঙ্গে চলে এসেছিলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মেক্সিকোয় সন্তানদের ছোট বয়স থেকেই নিজের পায়ে দাঁড়ানোর শিক্ষা দেওয়া হয়। তাঁর বাবা মাও সেই নিয়ম মেনে তাঁকে অল্প বয়সেই বাড়ির বাইরে স্বাধীনভাবে থাকার জন্য প্রস্তুত করেছিলেন। মাত্র ১৬ থেকে ১৭ বছর বয়সেই তাই বাবা মায়ের বাড়ি ছেড়ে নিজের মতো করে জীবন সামলাতে হয়েছিল সৃজলাকে। সেই সময়টা তাঁর জন্য কতটা কঠিন ছিল, সেই অভিজ্ঞতাও তিনি মঞ্চে ভাগ করে নিয়েছিলেন। অন্যদিকে, মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর বাবারও নির্দিষ্ট স্বপ্ন ছিল। সৃজলা মেধাবী হওয়ায় বাবা চেয়েছিলেন তিনি চিকিৎসক হন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই পথে না গিয়ে নিজের পছন্দের সৃজনশীল জগতকেই বেছে নিয়েছিলেন অভিনেত্রী।
অভিনয়ের পাশাপাশি লেখালেখির প্রতিও সৃজলার আগ্রহ ছিল। কবিতা লিখতেন তিনি এবং তাঁর লেখা কবিতার বইও প্রকাশিত হয়েছে। সময়ের সঙ্গে অভিনয়কেই নিজের পেশা হিসেবে বেছে নিয়ে বাংলা টেলিভিশনে পরিচিতি তৈরি করেন সৃজলা। ‘মন ফাগুন’ ধারাবাহিকে অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকদের কাছে বিশেষভাবে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন তিনি। ধীরে ধীরে একাধিক কাজের মাধ্যমে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন এই অভিনেত্রী। ফলে আজকের পরিচিত সৃজলাকে দেখে তাঁর সেই শুরুর দিনের কঠিন লড়াই অনুমান করা সহজ নয়। যে বয়সে অন্যদের জীবনে পরিবার ছিল সবচেয়ে বড় আশ্রয়, সেই সময়েই তাঁকে নিজের সিদ্ধান্ত নিজেকেই নিতে হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতাই হয়তো পরবর্তীকালে তাঁকে আরও স্বাধীনভাবে নিজের জীবন বেছে নেওয়ার সাহস দিয়েছিল।
গতকাল ‘বিগ বস বাংলা’র মঞ্চে নিজের অতীতের কথা বলতে গিয়ে সৃজলার কথায় জীবনের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির কথাও উঠে এসেছিল। খুব কম বয়সেই বাস্তব পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার কারণে জীবনের অনেক সত্য তিনি অন্যদের তুলনায় আগেই বুঝেছিলেন। তাঁর কাছে জীবনে কোনও কিছুই সহজে পাওয়া যায় না, সেই উপলব্ধিও তৈরি হয়েছিল অনেক আগে। আর সেই কারণেই ‘বিগ বস বাংলা’র ঘরে তাঁর অংশগ্রহণ শুধু একটি নতুন কাজ নয়, বরং নিজের ব্যক্তিত্ব তুলে ধরারও একটি সুযোগ হয়ে উঠেছিল। ধারাবাহিকে অভিনেতারা চরিত্রের আড়ালে থাকতে পারেন, কিন্তু এই ধরনের প্রতিযোগিতায় সেই সুযোগ থাকে না। প্রতিদিনের আচরণ, সম্পর্ক, আবেগ এবং সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই দর্শকদের সামনে নিজের আসল মানুষটাকে তুলে ধরতে হয়। ফলে সৃজলার পুরনো অভিজ্ঞতাগুলিও এই নতুন যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
আরও পড়ুনঃ হাতছাড়া হল সুযোগ? চূড়ান্ত পর্যায় পর্যন্ত গিয়েও শেষ মুহূর্তে কেন সরে দাঁড়ালেন শন বন্দ্যোপাধ্যায়? সৌরভের ‘বিগ বস বাংলা’-য় কি আর দেখা যাবে না তাঁকে? অভিনেতার না থাকার নেপথ্যে কী কারণ?
একসময় যে কিশোরীকে অল্প বয়সেই নিজের জীবন নিজেকে সামলাতে হয়েছিল, গতকাল সেই সৃজলাই দাঁড়িয়ে ছিলেন বাংলা টেলিভিশনের অন্যতম আলোচিত রিয়্যালিটি অনুষ্ঠানের মঞ্চে। জীবনের প্রতিকূলতা তাঁকে থামিয়ে দেয়নি, বরং ধীরে ধীরে নিজের মতো করে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি তৈরি করেছে। ‘বিগ বস বাংলা’র ঘরে তাঁর লড়াই তাই শুধু প্রতিযোগিতা, মনোনয়ন কিংবা সম্পর্কের সমীকরণে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তাঁর বহু বছরের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও। দর্শক এবার সৃজলাকে শুধু পরিচিত অভিনেত্রী হিসেবে নয়, জীবনের কঠিন সময় পেরিয়ে নিজের জায়গা তৈরি করা একজন মানুষ হিসেবেও দেখার সুযোগ পাবেন। গতকালের মঞ্চে নিজের জীবনের সেই অধ্যায় প্রকাশ্যে এনে অভিনেত্রী তাঁর ব্যক্তিত্বের আরও একটি দিক দর্শকদের সামনে তুলে ধরেছিলেন।






