“এই গানটা চলবে না, সমালোচনায় ভেসে যাবে” সবাই বারণ করেছিলেন, অথচ ‘সাথী’ ছবির বাজেটের ২০ গুণ আয় করেছিল সেটি! ২৪ বছর পর অজানা গল্প ফাঁস প্রযোজকের! বাবুল সুপ্রিয়ও গাইতে পারেননি, জিতকে সুপারস্টার বানিয়েছিল কোন সেই গান?

বাংলা বাণিজ্যিক ছবির ইতিহাসে কিছু ছবি শুধু বক্স অফিস সাফল্যের জন্য নয়, একটি নতুন যুগের সূচনা করার কারণেও বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে রয়েছে। সেই তালিকায় অন্যতম নাম ‘সাথী’ (Sathi)। ২০০২ সালের ১৪ জুন মুক্তি পাওয়া এই ছবি শুধু দর্শকদের মন জয় করেনি, বাংলা ছবির জগতে এক নতুন নায়কের আগমনও ঘটিয়েছিল। এই ছবির মাধ্যমেই নায়ক হিসেবে বড় পর্দায় আত্মপ্রকাশ করেন জিৎ (Jeet)। তাঁর বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন প্রিয়াঙ্কা উপেন্দ্র। পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন হরনাথ চক্রবর্তী এবং ছবিটি প্রযোজনা করেছিলেন শ্রীকান্ত মোহতা ও মহেন্দ্র সোনি। মুক্তির পর ছবিটি ব্যাপক সাফল্য পায় এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই জিৎ বাংলা ছবির অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক হয়ে ওঠেন।

আজ ২৪ বছর পর, এক সাক্ষাৎকারে ছবিটির প্রযোজক সেই সময়ের বেশ কিছু অজানা স্মৃতি ভাগ করে নিয়েছেন। তিনি জানান, ‘সাথী’ তৈরির সময় বাংলা ছবিতে নতুন নায়কের অভাব ছিল। সেই কারণেই একপ্রকার ঝুঁকি নিয়েই জিৎকে বেছে নেওয়া হয়। এর আগে তিনি দক্ষিণী একটি ছবিতে অভিনয় করেছিলেন। প্রযোজকদের মনে হয়েছিল, সঠিকভাবে উপস্থাপন করা গেলে এই তরুণ অভিনেতাকেই বাংলা ছবির পরবর্তী বড় নায়ক হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। পরে সময় প্রমাণ করে, তাঁদের সেই সিদ্ধান্ত একেবারেই ভুল ছিল না। কারণ ‘সাথী’ মুক্তির পর দর্শকদের মধ্যে যে জনপ্রিয়তা তৈরি হয়েছিল, তা খুব কম নতুন অভিনেতার ভাগ্যেই জোটে।

সাক্ষাৎকারে উঠে আসে ছবির সঙ্গীত তৈরির গল্পও। প্রযোজকের কথায়, সেই সময় তাঁদের ইচ্ছে ছিল দক্ষিণ ভারতের নামী সঙ্গীতশিল্পীদের সঙ্গে কাজ করার। সেই ভাবনা থেকেই সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় এস. পি. ভেঙ্কটেশকে। এটি ছিল তাঁর প্রথম বাংলা ছবির কাজ। ছবির গান ও আবহসঙ্গীত তৈরির কাজ শেষ হওয়ার পর পরিকল্পনা হয়েছিল জনপ্রিয় গায়ক বাবুল সুপ্রিয় গানগুলো গাইবেন। কিন্তু নানান কারণে শেষ পর্যন্ত তিনি কোনও গান রেকর্ড করতে পারেননি। এমনকি নিজের অক্ষমতার জন্য ক্ষমাও চেয়েছিলেন বলে জানান প্রযোজক। ফলে নতুন করে গায়ক খোঁজার চ্যালেঞ্জ সামনে এসে দাঁড়ায়।

এরপর অনেক খোঁজাখুঁজির পর এক আঞ্চলিক গায়কের সন্ধান মেলে, তাঁর নাম মনু (Manu)। তাঁকেই গান রেকর্ড করার সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু গান শোনার পর অনেকেরই আপত্তি ছিল। কারণ বেশ কিছু শব্দের উচ্চারণ প্রচলিত বাংলা উচ্চারণের মতো ছিল না। প্রযোজকের কথায়, তিনি যাঁদেরই গানটি শুনিয়েছেন, তাঁদের অনেকেই বলেছিলেন এমন গান ছবিতে ব্যবহার করা হলে সমালোচনা হতে পারে। কেউ কেউ মনে করেছিলেন, দর্শক গানটি গ্রহণ করবেন না। কিন্তু প্রযোজক সেই সব মন্তব্যে গুরুত্ব না দিয়ে নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, নিখুঁত উচ্চারণের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে গানের আবেগ এবং অনুভূতি।

সেই বিশ্বাসই শেষ পর্যন্ত সঠিক প্রমাণিত হয়। ছবি মুক্তির পর একদিকে যেমন জিৎ রাতারাতি জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে যান, তেমনই ছবির গানগুলোও মানুষের মুখে মুখে ফিরতে শুরু করে। প্রযোজক আবেগঘন কণ্ঠে জানান, ছবিটি তৈরি করতে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছিল, তার থেকেও অনেক বেশি সাফল্য এনে দিয়েছিল ছবির সঙ্গীত। তাঁর কথায়, “সাথী সিনেমার মোট বাজেটের কুড়ি গুণ টাকা ইনকাম করেছিল শুধুমা ‘ও বন্ধু’ গানটি, আজও একইভাবে জনপ্রিয়!” এত বছর পরেও সেই গান মানুষের মনে একইভাবে জায়গা ধরে রেখেছে বলেই মনে করেন তিনি।

আরও পড়ুনঃ সোনা’গাছিতে এমন এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন মহানায়ক, যা কেউ কল্পনাও করেননি! উত্তম কুমারকে হঠাৎ ২৫ টাকা দিয়েছিলেন এক পতি’তা! পাশে দাঁড়িয়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন বিকাশ রায়, কিন্তু কেন?

আজ ‘সাথী’ মুক্তির ২৪ বছর পূর্ণ হওয়ার পরও ছবিটির কথা উঠলেই দর্শকদের মনে প্রথমেই ভেসে ওঠে একটি নির্দিষ্ট গান। জিৎ এবং প্রিয়াঙ্কা উপেন্দ্রর রোম্যান্টিক রসায়নের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সেই গানটির নাম ‘ও বন্ধু তুমি শুনতে কি পাও’। গানটির পুরুষ সংস্করণে কণ্ঠ দিয়েছিলেন মনো এবং মহিলা সংস্করণে গেয়েছিলেন অনুরাধা শ্রীরাম। গানের কথা লিখেছিলেন গৌতম সুশ্মিত। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলেছে, কিন্তু বাংলা ছবির ইতিহাসে ‘সাথী’ এবং তার এই জনপ্রিয় গান এখনও নস্টালজিয়ার অন্যতম বড় অংশ হয়ে রয়েছে।

You cannot copy content of this page