“ছায়াদেবীর মতো দক্ষ অভিনেত্রীদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যেভাবে ব্যক্তিত্ব বজায় রেখে কাজ করেছিল তা ভোলার নয়!” বয়সে ছোট হলেও পর্দায় অতুলনীয়, একসঙ্গে ‘মৌচাক’ থেকে ‘স্বয়ংসিদ্ধা’, জুটিতে কাঁপিয়েছিলেন গোটা বাংলা, আজ সেই নায়িকার চিরবিদায়ে ভেঙে পড়লেন রঞ্জিত মল্লিক! শো’কাহত বর্ষীয়ান অভিনেতা স্মৃতির পাতা হাতড়ে শোনালেন, মিঠু মুখার্জির সঙ্গে কাজের চোখে জল আনা অভিজ্ঞতা!

প্রয়াত কলকাতার ‘রেখা’ অভিনেত্রী মিঠু মুখার্জি। ৭১ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে ক্যা*ন্সারের সঙ্গে লড়াই করছিলেন অভিনেত্রী। শেষ পর্যন্ত মুম্বইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে গত রবিবার তাঁর মৃত্যু হয়। মিঠু মুখার্জির প্রয়াণের খবর ছড়িয়ে পড়তেই বাংলা বিনোদন জগতে নেমে আসে শোকের ছায়া। তাঁর সঙ্গে ‘স্বয়ংসিদ্ধা’ ছবিতে কাজ করেছিলেন বর্ষীয়ান অভিনেতা রঞ্জিত মল্লিক। সহঅভিনেত্রীর মৃত্যুর খবর শুনে গভীরভাবে শোকাহত হন তিনিও এবং সমাজ মাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ করে নিজের প্রতিক্রিয়া জানান।

মিঠু মুখার্জির মৃত্যুর খবর প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেননি রঞ্জিত মল্লিক। তাঁর কথায়, এত কম বয়সে সহকর্মীর চলে যাওয়ার খবর তাঁর কাছে অত্যন্ত আকস্মিক ছিল। তিনি জানান, সকালে খবরটি শোনার পরও বেশ কিছুক্ষণ তাঁর মনে হচ্ছিল, হয়তো খবরটি ভুল। কারণ বর্তমানে অনেক সময় ভুল খবর ছড়িয়ে পড়ে বলেই প্রথমে বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি তিনি। আজকালের সাক্ষাৎকারে রঞ্জিত মল্লিক বলেন, “খবরটা সত্যিই ভীষণ ধাক্কার। মন থেকে মেনে নেওয়া কঠিন হচ্ছে। ও আমাদের থেকে বয়সে অনেকটাই ছোট ছিল, তাই এমন একটা খবর আসবে, সেটা কখনও ভাবিনি। সকালে খবরটা শোনার পরও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, মনে হচ্ছিল হয়তো ভুল খবর, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বুঝলাম সত্যিই মিঠু আর নেই।”

দীর্ঘদিন একসঙ্গে কাজ করার কারণে মিঠু মুখার্জির সঙ্গে একাধিক স্মৃতি রয়েছে রঞ্জিত মল্লিকের। ‘স্বয়ংসিদ্ধা’ ছবিতে অভিনেত্রীর অভিনয় আজও তাঁর মনে গেঁথে রয়েছে বলে জানান তিনি। বিশেষ করে সেই ছবিতে মিঠু যে চরিত্রটি করেছিলেন, তার অভিনয় সহজে ভোলার নয় বলেই মনে করেন বর্ষীয়ান অভিনেতা। ছায়াদেবীর মতো দক্ষ অভিনেত্রীদের সঙ্গে কাজ করার সময়ও মিঠু নিজের আলাদা ব্যক্তিত্ব ধরে রেখেছিলেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। আজকালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রঞ্জিত মল্লিকের কথায়, “মিঠু অসাধারণ অভিনেত্রী ছিল। ‘স্বয়ংসিদ্ধা’য় ও যে অভিনয় করেছিল, সেটা মনে রাখার মতো।

ছায়াদেবীদের মতো বড় শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করার সময়ও নিজের ব্যক্তিত্ব বজায় রেখে যেভাবে অভিনয় করেছিল, সেটাও আমার মনে থাকবে। ওর অভিনয়ের সেই দক্ষতা এবং পর্দায় উপস্থিতি সত্যিই সহজে ভুলে যাওয়ার মতো নয়।” মিঠু মুখার্জির সঙ্গে কাজের স্মৃতির পাশাপাশি উত্তমকুমারের সঙ্গেও তাঁর কাজের কথা মনে পড়ে যায় রঞ্জিত মল্লিকের। ১৯৭৩ সালের ‘মৌচাক’ ছবিতে উত্তম কুমারের সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন মিঠু। সেই সময়কার নানা স্মৃতিও মিঠুর মৃত্যুর খবর শোনার পর তাঁর মনে পড়ছিল বলে জানান রঞ্জিত মল্লিক। তিনি বলেন, “মিঠু উত্তমদার সঙ্গেও ‘মৌচাক’ ছবিতে কাজ করেছিল।

ওর চলে যাওয়ার খবর শুনে সেই পুরনো দিনের অনেক কথাই বারবার মনে পড়ছিল। এতদিনের পরিচিত এবং সহকর্মী একজন মানুষকে এভাবে হারানোর খবর মেনে নেওয়া সত্যিই কঠিন। ও যেখানেই থাকুক, শান্তিতে থাকুক, আমি ওর আত্মার শান্তি কামনা করি।” খুব অল্প সময়ের মধ্যেই অভিনয় এবং সৌন্দর্যের কারণে দর্শকের নজরে এসেছিলেন মিঠু মুখার্জি। ১৯৭১ সালে ‘শেষ পর্ব’ ছবির মাধ্যমে অভিনয় জগতে তাঁর পথচলা শুরু হয়। এরপর ১৯৭৩ সালে দীনেন গুপ্ত পরিচালিত ‘মর্জিনা আবদুল্লাহ’ ছবিতে নাম ভূমিকায় অভিনয় করে দ্রুত জনপ্রিয়তা পান তিনি। পরবর্তী সময়ে একাধিক বাংলা এবং হিন্দি ছবিতে অভিনয় করেছেন মিঠু মুখার্জি। ১৯৯০ সালে ‘আশ্রিতা’ ছবিতে তাঁকে শেষবার বড়পর্দায় দেখা যায়, এরপর ধীরে ধীরে অভিনয় থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন তিনি।

আরও পড়ুনঃ “ওঁর বিষয়ে বিশেষ কিছু জানি…” “খুবই মিশুকে ছিল, ওঁর সঙ্গে খুব একটা কাজ করিনি, একটাই ছবিতেই দেখেছি…” মিঠু মুখার্জির মৃ’ত্যুর খবরে ভেঙে পড়লেন সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়! কণ্ঠে ঝরে পড়ল আক্ষেপ, ‘মৌচাক’-এর সেই সহঅভিনেত্রীকে নিয়ে ঠিক কী বললেন বর্ষীয়ান অভিনেত্রী?

এদিন তাঁর প্রয়াণের খবর নিশ্চিত করেন প্রযোজক ও পরিচালক প্রবীর রায়। আজকাল ডট ইনকে তিনি জানান, মিঠু দীর্ঘদিন মুম্বইয়ে ছিলেন, কয়েক বছর আগে কলকাতায় ফিরে এসেছিলেন এবং বহু বছর ধরেই কাজ থেকে দূরে ছিলেন। প্রবীর রায় বলেন, “মিঠু অনেক বছর মুম্বইয়ে ছিল, পরে কয়েক বছর আগে কলকাতায় ফিরে আসে। অনেক দিন ধরেই কাজের জগত থেকে দূরে ছিল, অথচ একসময় কত ভালো ভালো কাজ করেছে। ওর সমসাময়িক অনেক শিল্পীই আজ আর নেই, সুমিত্রা, জয়শ্রীও চলে গিয়েছেন। মিঠুর চলে যাওয়ায় সেই প্রজন্মের আরও একজন শিল্পীকে হারাল বাংলা বিনোদন জগৎ।”

You cannot copy content of this page