বর্তমান সময়ে মানসিক অবসাদ, একাকীত্ব এবং চাপ যেন নীরবে মানুষের জীবনকে গ্রাস করে চলেছে। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও আত্মহত্যার খবর সামনে আসছে, আর সেই ঘটনাগুলো সমাজকে বারবার নাড়িয়ে দিচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, বাইরে থেকে যাঁদের স্বাভাবিক, হাসিখুশি এবং সফল বলে মনে হয়, তাঁদের মধ্যেও অনেকেই ভিতরে ভিতরে গভীর মানসিক লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন। পরিবার, কাজের চাপ, সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রোল, ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েন কিংবা দীর্ঘদিনের মানসিক অবসাদ নানা কারণ মিলিয়ে অনেকেই ভেঙে পড়ছেন। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেই কষ্ট বাইরে থেকে বোঝা যায় না। ফলে আচমকাই ঘটে যাচ্ছে ভয়ঙ্কর সব ঘটনা।
এই আবহেই সম্প্রতি প্রয়াত হয়েছেন বাংলা চলচ্চিত্র জগতের পরিচিত পরিচালক অনীক দত্ত। তাঁর মৃত্যু ঘিরে এখনও ধোঁয়াশা কাটেনি। প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, বহুতলের ছাদ থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন তিনি। পরে হাসপাতালে নিয়ে গেলে মৃত্যু হয়। ঘটনাস্থল থেকে একটি সুইসাইড নোটও উদ্ধার হয়েছে বলে জানা যায়। দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলেন পরিচালক, এমন কথাও সামনে এসেছে তাঁর ঘনিষ্ঠদের মুখে। পরিচালকের চিকিৎসকও জানিয়েছেন, তিনি ডিপ্রেশন, আতঙ্ক এবং ঘুমের সমস্যায় ভুগছিলেন। বাইরে থেকে স্বাভাবিক মনে হলেও ভিতরে ভিতরে তিনি যে গভীর মানসিক চাপে ছিলেন, তা মৃত্যুর পর আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
অন্যদিকে, সোশ্যাল মিডিয়ার জনপ্রিয় মুখ সায়নী চক্রবর্তীর রহস্যমৃত্যুও একইভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে নেটদুনিয়াকে। পশুপ্রেমী ভ্লগার হিসেবে ‘সুন্দরীর দিদি’ নামে পরিচিত সায়নী খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বহু মানুষের ভালোবাসা পেয়েছিলেন। গরু ‘সুন্দরী’ এবং ‘পরী’-কে নিয়ে তাঁর ভিডিও নেটমাধ্যমে ভাইরাল হত নিয়মিত। সবসময় হাসিখুশি, প্রাণবন্ত এবং ইতিবাচক একজন মানুষ হিসেবেই তাঁকে দেখেছেন অনুরাগীরা। কিন্তু হঠাৎ তাঁর মৃত্যুর খবর সামনে আসতেই হতবাক হয়ে গিয়েছে সকলে। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের অনুমান, তিনি আত্মঘাতী হয়েছেন। সম্প্রতি নৈহাটির বড়মা মন্দিরে হেনস্থার শিকার হওয়ার ঘটনাও তিনি সামনে এনেছিলেন নিজের ভিডিওর মাধ্যমে।
আরও পড়ুন: “আবার একটা ২৯ তারিখ…শ্ম’শানে দেখা হবে, সহজ তবুও জানতে পারবে না ওর বাবার মৃ’ত্যুর কারণ” অনীক দত্তর শেষযাত্রায় বি’স্ফোরক জিতু কমল! রাহুল অরুণোদয়ের মৃ’ত্যুতে শিল্পীদের ‘মেকি’ প্রতিবাদ থেকে বর্তমান সরকার, কাউকেই ছাড়লেন না অভিনেতা!
অনীক দত্ত বা সায়নী চক্রবর্তী দু’জনের জীবন একেবারে আলাদা হলেও তাঁদের মৃত্যুর পর একটি বিষয়ই সবচেয়ে বেশি সামনে আসছে, তা হল মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব। আমরা অনেক সময় ধরে নিই, যে মানুষ সবসময় হাসে, কাজ করে, অন্যদের আনন্দ দেয়, সে নিশ্চয়ই ভালো আছে। কিন্তু বাস্তবটা সবসময় তেমন হয় না। অনেকেই নিজের কষ্ট, ভয় বা অবসাদের কথা কাউকে বলতে পারেন না। ভিতরে ভিতরে জমতে থাকা সেই চাপ একসময় ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়। তাই চারপাশের মানুষদের আচরণ, কথাবার্তা বা হঠাৎ বদলে যাওয়া অভ্যাসের দিকে নজর রাখা খুবই জরুরি। কেউ যদি নিজেকে গুটিয়ে নেয়, অকারণে হতাশার কথা বলে, সবকিছু থেকে দূরে সরে যেতে চায় বা বারবার মৃত্যুর কথা উল্লেখ করে, তাহলে বিষয়টিকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল পাশে থাকা। কাউকে বিচার না করে তাঁর কথা মন দিয়ে শোনা প্রয়োজন। প্রয়োজন হলে পরিবার, বন্ধু বা মনোবিদের সাহায্য নেওয়াও জরুরি। অনেক সময় শুধু একজন মানুষ পাশে দাঁড়ালেই বড় বিপদ এড়ানো সম্ভব। সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রোল, অপমান বা মানসিক চাপে কাউকে একা ফেলে না রেখে সহানুভূতির সঙ্গে আচরণ করা দরকার। কারণ, জীবনের কঠিন মুহূর্তে একজন মানুষের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় নিরাপত্তা, বোঝাপড়া এবং মানসিক সমর্থন। অনীক দত্ত ও সায়নী চক্রবর্তীর মৃত্যু তাই শুধু দু’টি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং সমাজের কাছে এক বড় সতর্কবার্তা মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্বকে আর অবহেলা করা চলবে না।






