“অনেক সময় আর বাঁচার ইচ্ছেই থাকে না…” মৃ’ত্যুর আগে কতটা মান’সিক যন্ত্র’ণায় ভুগছিলেন অনিক দত্ত? পরিচালকের মনোবিদের মন্তব্যে কি সামনে এল, তাঁর জীবনের সেই অজানা অন্ধকার দিক?

প্রয়াত পরিচালক অনিক দত্ত, বুধবার দুপুরে আচমকাই ছড়িয়ে পড়ে সেই দুঃসংবাদ। জানা যায়, হিন্দুস্তান পার্ক এলাকার প্রাক্তন স্ত্রীর বাড়ির ছাদ থেকে পড়ে গুরুতর জখম হন তিনি। দ্রুত তাঁকে ঢাকুরিয়ার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও শেষরক্ষা হয়নি। হাসপাতাল সূত্রে পরিচালকের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ৬৬ বছর। মাত্র পাঁচ দিন আগেই জন্মদিন পালন করেছিলেন তিনি। সেই সময় পুরনো স্মৃতি ভাগ করে নিয়েছিলেন সমাজমাধ্যমেও। বাংলা চলচ্চিত্র জগতে নিজের স্বতন্ত্র ভাবনা ও ব্যতিক্রমী সিনেমার জন্য বরাবরই পরিচিত ছিলেন অনীক দত্ত। তাঁর মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে টলিউড ও সাংস্কৃতিক মহলে।

পরিচালকের মৃত্যুর ঘটনায় ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। তাঁর বাড়িতে পৌঁছয় তদন্তকারী দল। কীভাবে এই দুর্ঘটনা ঘটল, তা নিয়ে এখনও সরকারি ভাবে কোনও মন্তব্য করেনি পুলিশ। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদেরও ঘটনাস্থলে রয়েছেন, এবং ময়নাতদন্তের জন্য পরিচালকের দেহ এসএসকেএম হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এই ঘটনার পর থেকেই টলিউডের একাধিক পরিচিত মুখ হাসপাতালে পৌঁছতে শুরু করেন।

এই আবহেই সামনে আসে পরিচালকের মনোবিদ চিকিৎসক ডা. অরিজিৎ বসুর বক্তব্য। তিনি জানান, প্রায় আড়াই থেকে তিন বছর ধরে তাঁর চিকিৎসাধীন ছিলেন অনীক দত্ত। প্রথম যখন পরিচালক তাঁর কাছে আসেন, তখন তিনি প্রবল মানসিক চাপে ছিলেন। ঘুমের সমস্যা, হঠাৎ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়া, প্যানিক অ্যাটাক এবং গভীর ডিপ্রেশনের মতো সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। চিকিৎসক জানান, ধীরে ধীরে ওষুধ ও কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছিলেন অনীক। তবে মাঝেমধ্যেই ওষুধ নিয়মিত খেতে ভুলে যেতেন। অনেক সময় ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়েও ভয় পেতেন তিনি। শেষবার যখন চিকিৎসকের সঙ্গে তাঁর কথা হয়, তখন নতুন একটি ওষুধ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু সেই ওষুধকে ‘টক্সিক’ বলেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন পরিচালক। এরপর গত ছয় মাস আর চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি তিনি।

ডা. অরিজিৎ বসুর কথায়, শেষ দিকে অনীক দত্ত মানসিকভাবে ভীষণ ভেঙে পড়েছিলেন। তিনি নাকি মাঝেমধ্যেই বলতেন, “অনেক সময় আর বাঁচার ইচ্ছেই থাকে না।” যদিও চিকিৎসকের দাবি, তিনি কখনও ভাবেননি যে পরিচালক এমন কোনও চরম সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কারণ, নিজের নিরাপত্তা ও শারীরিক অবস্থাকে নিয়ে অনীক বরাবরই সচেতন ছিলেন। ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে তিনি বারবার প্রশ্ন করতেন, নিরাপদ চিকিৎসা নিয়েই বেশি ভাবতেন। চিকিৎসকের মতে, তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও পেশাগত চাপ মিলিয়ে একটা দীর্ঘ মানসিক লড়াই চলছিল। কিছু সিনেমা নিয়ে বিতর্ক, কাজের অনিশ্চয়তা এবং নিজের শিল্পীসত্তাকে টিকিয়ে রাখার চাপ তাঁকে ভিতর থেকে ক্লান্ত করে তুলেছিল। তবুও চিকিৎসক তাঁকে বারবার বুঝিয়েছিলেন, তাঁর মতো একজন শিল্পীর কাজ বাংলা সংস্কৃতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পড়ুন: বাঁ দিকে গুরুতর আঘাত! স্কাল ভেঙে ফুসফুসে র’ক্ত! প্রকাশ্যে অনীক দত্তর ময়নাতদন্ত রিপোর্ট, শরীরের একাধিক অংশে ঘর্ষণের গভীর দাগ! তবে কি নিছক আ’ত্মহ’ত্যা নয়? পরিচালকের রহস্যমৃ’ত্যু ঘিরে বাড়ছে ধোঁয়াশা! উঠে এলো আরও হাড়হিম করা তথ্য?

বাংলা সিনেমায় অনীক দত্তের অবদান নিঃসন্দেহে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। বিজ্ঞাপনের জগৎ থেকে চলচ্চিত্র পরিচালনায় এসে তিনি প্রথম বড় সাফল্য পান ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ ছবির মাধ্যমে। এরপর ‘আশ্চর্য প্রদীপ’, ‘মেঘনাদ বধ রহস্য’, ‘ভবিষ্যতের ভূত’, ‘বরুণবাবুর বন্ধু’, ‘অপরাজিত’ এবং শেষ ছবি ‘যত কাণ্ড কলকাতাতেই’-এর মতো একাধিক আলোচিত সিনেমা তৈরি করেন। তাঁর ছবির বিষয়বস্তু, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং ব্যঙ্গাত্মক উপস্থাপনা নিয়ে বহুবার বিতর্ক তৈরি হলেও নিজের অবস্থান থেকে সরেননি তিনি। আদ্যোপান্ত বামপন্থী ভাবনার মানুষ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন পরিচালক। কিন্তু পর্দার পিছনে যে তিনি দীর্ঘদিন ধরে এক কঠিন মানসিক লড়াইয়ের মধ্যে ছিলেন, তা হয়তো এতদিন প্রকাশ্যে আসেনি। তাঁর আকস্মিক মৃত্যু সেই অজানা অন্ধকার দিকটাকেই আরও একবার সামনে এনে দিল।

You cannot copy content of this page