প্রথম অডিশনেই রিজেক্টেড সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়! একটা ‘না’ বদলে দিয়েছিল ইতিহাস! “অপরাজিত”-তে বাদ পড়া মুখই হয়ে উঠল “অপুর সংসার”-এর অমর অপু! সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে পছন্দ করতেন না সত্যজিৎ রায়? প্রথম দেখাতেই কেন ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তাঁকে?

ভারতীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসে যাঁর নাম এক অনন্য উচ্চতায় উজ্জ্বল, তিনি হলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে তিনি আজও দর্শকদের মনে জায়গা করে আছেন। সাহিত্য, থিয়েটার এবং সিনেমা, এই তিন জগতেই সমান দক্ষতায় বিচরণ করা সৌমিত্র শুধু একজন অভিনেতা ছিলেন না, ছিলেন এক বহুমুখী শিল্পী। তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলো আজও বাঙালি চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।

তবে এই কিংবদন্তি অভিনেতার যাত্রা শুরুটা কিন্তু এতটা সহজ ছিল না। বাংলা চলচ্চিত্রের আরেক মহান পরিচালক সত্যজিৎ রায় প্রথমে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে সরাসরি তাঁর ছবির জন্য নির্বাচন করেননি। এমনকি শুরুতে তিনি সৌমিত্রকে নিয়ে কোনো দৃঢ় সিদ্ধান্তও নেননি। অভিনয় জীবনের একেবারে শুরুর দিকে তিনি একপ্রকার প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে চলচ্চিত্র ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় এনে দেয়।

সেই সময় সত্যজিৎ রায় ‘পথের পাঁচালী’ তৈরির পর নতুন এক ধরনের সিনেমা ভাষা গড়ে তুলছিলেন। তিনি অপু চরিত্রের জন্য একেবারে নতুন মুখ খুঁজছিলেন। সৌমিত্র তখন থিয়েটার ও সাহিত্যের জগতে সক্রিয় থাকলেও চলচ্চিত্রে তাঁর অভিজ্ঞতা ছিল না। এই কারণেই প্রথম দফায় তাঁকে সরাসরি অপুর চরিত্রের জন্য বেছে নেওয়া হয়নি। সত্যজিৎ চেয়েছিলেন এমন একজন মুখ, যিনি চরিত্রের ভেতরে পুরোপুরি মিশে যেতে পারবেন, আর সেই অনুসন্ধানেই তিনি তখন অন্যদের দিকে নজর দিয়েছিলেন।

প্রাথমিকভাবে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে রিজেকশন করা হয়েছিল কারণ অপু চরিত্রের জন্য সত্যজিৎ রায় মনে করেছিলেন তিনি একটু বেশি লম্বা ছিলেন। পরিচালক চেয়েছিলেন এমন একজন অভিনেতা, যার শারীরিক গঠন অপু চরিত্রের কিশোরসুলভ সরলতার সঙ্গে পুরোপুরি মানানসই হবে। এছাড়া তিনি তখনো চলচ্চিত্রে নতুন ছিলেন এবং ক্যামেরার সামনে কাজের অভিজ্ঞতাও ছিল না। এইসব কারণ মিলেই প্রথমে তাঁকে সেই চরিত্রের জন্য উপযুক্ত মনে করা হয়নি।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। একদিন সত্যজিৎ রায়ের ইউনিটের সদস্য নিত্যানন্দ দত্ত সৌমিত্রকে ডেকে নিয়ে যান। শুরু হয় তাঁর সঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের প্রথম সাক্ষাৎ। সেই সাক্ষাতে পরিচালক তাঁর অভিনয়, পড়াশোনা ও চিন্তাভাবনা সম্পর্কে জানতে চান। যদিও সেদিনই কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, তবে সত্যজিৎ রায় তাঁর মধ্যে লুকিয়ে থাকা সম্ভাবনা লক্ষ্য করেছিলেন। এরপর কিছুদিন তাঁকে পর্যবেক্ষণে রাখেন এবং বিভিন্ন আলোচনায় যুক্ত করেন। শেষ পর্যন্ত ‘অপুর সংসার’ ছবির জন্য অপু চরিত্রে সৌমিত্রকে নির্বাচন করা হয়, যা তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ‘অপুর সংসার’-এ কাজ করার পর রাতারাতি পরিচিতি পান এবং বাংলা সিনেমায় এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। পরবর্তীতে তিনি শুধু অপু চরিত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং একের পর এক বৈচিত্র্যময় চরিত্রে অভিনয় করে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেছেন। সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শুধুমাত্র একটিমাত্র ছবিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং মোট ১৪টির মতো ছবিতে তাঁরা একসঙ্গে কাজ করেছেন। ‘ফেলুদা’ চরিত্রেও তাঁর উপস্থিতি দর্শকদের মধ্যে গভীর ছাপ ফেলে।

আরও পড়ুনঃ গোপনে মন্দিরে বিয়ে! স্বামী মিঠুন চক্রবর্তীর সঙ্গে শ্রীদেবীর ‘অ’বৈধ সম্পর্ক’ প্রকাশ্যে আসতেই, আ’ত্মহ’ত্যার করতে যান স্ত্রী যোগিতা বালি! তারপর কী ঘটেছিল?

আজও চলচ্চিত্র ইতিহাসে সত্যজিৎ রায় ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়-এর সম্পর্ককে এক অসাধারণ সৃজনশীল মেলবন্ধন হিসেবে দেখা হয়। প্রথমে প্রত্যাখ্যান থেকে শুরু হয়ে যে যাত্রা অপুর সংসার পর্যন্ত গড়িয়েছিল, তা শুধু একটি সফলতার গল্প নয়, বরং প্রতিভা, বিশ্বাস এবং সময়ের সঠিক মিলনের এক অনন্য উদাহরণ।

You cannot copy content of this page