বাংলা সিনেমার ইতিহাসে মহুয়া রায়চৌধুরীর নাম আজও একইরকম উজ্জ্বল। মাত্র অল্প কয়েক বছরের অভিনয় জীবনেই তিনি দর্শকের মনে এমন জায়গা করে নিয়েছিলেন, যা আজও অমলিন। কিন্তু ১৯৮৫ সালের ২২ জুলাই তাঁর আকস্মিক মৃত্যু গোটা টলিপাড়াকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। সেই ঘটনার এত বছর পরেও তাঁর মৃত্যু নিয়ে নানা প্রশ্ন, জল্পনা এবং রহস্য আজও পুরোপুরি কাটেনি। কীভাবে এমন পরিণতি হল, তা নিয়ে এখনও নিশ্চিত উত্তর মেলেনি। সম্প্রতি অভিনেতা বিপ্লব চট্টোপাধ্যায় নিজের স্মৃতিচারণে সেই সময়ের একাধিক অজানা ঘটনার কথা তুলে ধরেছেন।
বিপ্লব চট্টোপাধ্যায় জানান, মহুয়া বাইরে থেকে সবসময় প্রাণবন্ত এবং হাসিখুশি থাকলেও নিজের ব্যক্তিগত কষ্ট খুব একটা কারও সঙ্গে ভাগ করে নিতেন না। তাঁর কথায়, “ওঁর মৃত্যু নিয়ে একটা রহস্য তো রয়েই গেছে। স্বাভাবিক মৃত্যু কি না জিজ্ঞেস করলে বলব, জানি না! এত প্রাণোচ্ছ্বল একটা মেয়ে… কিন্তু একটা দিক থেকে ভীষণ চাপা ছিল। ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়ে খুব একটা কথা বলত না। একটু কিছু বলতে বলতেই কেমন যেন প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে দিত।” অভিনেতার মতে, মহুয়ার মনের ভেতরের অনেক কথাই হয়তো অজানাই থেকে গিয়েছিল।
শুধু সিনেমা নয়, মঞ্চেও মহুয়াকে দেখতে চেয়েছিলেন বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়। তিনি নিজে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কাছে অনুরোধ করেছিলেন, তাঁর নাটকের দলে যেন মহুয়াকে নেওয়া হয়। তবে সেই ইচ্ছা আর পূরণ হয়নি। কেন সেই সুযোগ তৈরি হল না, তার উত্তর আজও তাঁর অজানা। এরপরই আসে সেই মর্মান্তিক দিন, যখন দগ্ধ অবস্থায় মহুয়ার দেহ টালিগঞ্জের এনটি ওয়ান স্টুডিওতে আনা হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন তরুণ মজুমদার, দেবশ্রী রায়, রঞ্জিত মল্লিক-সহ বহু শিল্পী, যারা শেষবারের মতো প্রিয় অভিনেত্রীকে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন।
কিন্তু সেই দিনের একটি দৃশ্য আজও ভুলতে পারেন না বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়। তিনি জানান, স্টুডিওর যেসব পথকুকুরকে মহুয়া প্রতিদিন নিজের হাতে খেতে দিতেন, তারাও যেন সেদিন অন্যরকম আচরণ করেছিল। অভিনেতার কথায়, তারা এক কোণে নিশ্চুপ হয়ে বসে ছিল। কোনও ডাকাডাকি বা ছোটাছুটি নয়, যেন তারাও বুঝতে পেরেছিল তাদের পরিচিত মানুষটি আর কখনও ফিরে আসবেন না। সেই দৃশ্য দেখে তাঁর মনে গভীর দাগ কেটে যায়। তিনি বলেন, “ওরাও কি সব বুঝতে পেরেছিল? জানি না! সেদিনই বুঝে গিয়েছিলাম, এতখানি দগ্ধ শরীর নিয়ে মহুয়া লড়াইটা আর টানতে পারবে না।”
মহুয়ার মৃত্যুকে ঘিরে সেই সময় নানা ধরনের জল্পনা ছড়িয়ে পড়েছিল। পারিবারিক অশান্তি, মানসিক চাপ কিংবা অন্য কোনও কারণ, বিভিন্ন আলোচনা হলেও কোনও বিষয়ই শেষ পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি। তাই এত বছর পরেও তাঁর মৃত্যু বাংলা চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম আলোচিত রহস্য হিসেবেই রয়ে গেছে। আজও এই ঘটনা নিয়ে আলোচনা হলে নতুন করে ফিরে আসে সেই অজানা প্রশ্নগুলো। বন্ধুকে স্মরণ করতে গিয়ে বিপ্লব চট্টোপাধ্যায় শেষ পর্যন্ত আবেগ লুকিয়ে রাখতে পারেননি।
আরও পড়ুনঃ “বাংলার নারীদের লাখপতি বানাব আমরা, অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার যথেষ্ট নয়…” দাবি লকেট চট্টোপাধ্যায়ের! ভাতা নয়, তাহলে কীভাবে রাজ্যের মেয়েরা হবেন আর্থিকভাবে স্বনির্ভর? সরকারের ঝুলিতে রয়েছে ঠিক কী কী নতুন পরিকল্পনা, জানালেন অভিনেত্রী তথা বিজেপি নেত্রী?
তাঁর মতে, মহুয়া শুধু একজন সফল অভিনেত্রীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন অত্যন্ত বড় মনের একজন মানুষ। স্টুডিওর কর্মী থেকে শুরু করে পথকুকুর, সবার প্রতিই ছিল তাঁর সমান মমতা। তাই হয়তো মৃত্যুর দিন সেই নীরব দৃশ্য আজও তাঁর স্মৃতিতে অমলিন হয়ে রয়েছে। বিপ্লবের কথায়, “অনেক বড় মনের শিল্পী ছিল ও…” আর সেই কারণেই, এত বছর পরেও মহুয়া রায়চৌধুরীর স্মৃতি বাংলা সিনেমাপ্রেমীদের হৃদয়ে একইভাবে বেঁচে আছে।






