“এদের জন্য আমি নিজেকে তিলে তিলে ফুরিয়ে ফেললাম…কেউ সেদিন আমায় বাঁচাতে এল না, টুঁ শব্দও করল না!” সত্যিই কি আ’ত্মহ*ত্যার চেষ্টা করেছিলেন উত্তম কুমার? জীবনের শেষ দিকে কেন মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন তিনি? ৪৭ বছর পর, মহানায়কের মৃ’ত্যুবার্ষিকীতে বি*স্ফোরক সব তথ্য সামনে আনলেন বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়!

২৪ জুলাই মানেই বাংলা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে এক আবেগের দিন। ১৯৮০ সালের এই দিনেই চিরবিদায় নেন বাংলা সিনেমার মহানায়ক উত্তম কুমার (Uttam Kumar)। তাঁর প্রয়াণের এত বছর পরেও তাঁকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ এতটুকু কমেনি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর জীবন নিয়ে নতুন নতুন আলোচনা সামনে এসেছে। সম্প্রতি আবারও একটি প্রশ্ন ঘুরতে শুরু করেছে, জীবনের শেষ দিকে কি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন উত্তম কুমার? এমনকি কেউ কেউ দাবি করছেন, তিনি নাকি নিজের জীবন শেষ করে দিতে চেয়েছিলেন। এই বিতর্কের মাঝেই মুখ খুলেছেন তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ অভিনেতা বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়, যিনি একসময় মহানায়ককে নিজের বড় দাদার মতোই দেখতেন।

বিশ্বজিৎ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, উত্তম কুমার এমন মানুষ ছিলেন না। তাঁর কথায়, “উত্তমদা ভীষণ শক্ত মনের ছিলেন। তিনি আত্মহত্যা করার মানুষই নন। শুনেছি, শেষ মুহূর্তেও তিনি তাঁর প্রিয় চিকিৎসক হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ সুনীল সেনকে বলেছিলেন, ‘সুনীলদা, এ বারের মতো বাঁচিয়ে দিন’!” বিশ্বজিতের মতে, এই একটি কথাই প্রমাণ করে মহানায়কের বেঁচে থাকার প্রবল ইচ্ছা ছিল। তিনি আরও স্মরণ করেন, যেদিন উত্তম কুমারের মৃত্যুর খবর আসে, সেদিন তিনি মুম্বইয়ে ছিলেন। পরিচালক শক্তি সামন্ত ফোন করে তাঁকে সেই দুঃসংবাদ দেন। তখনই আলোচনা হয়েছিল কলকাতায় এলেও শেষবার দেখা সম্ভব হবে না। তাই মুম্বইতেই বসে তাঁরা মহানায়ককে স্মরণ করেছিলেন।

আলোচনায় বিশ্বজিৎ উত্তম কুমারের ব্যক্তিগত জীবনের নানা দিকও তুলে ধরেন। তাঁর মতে, পর্দার সুপারস্টারের আড়ালে ছিলেন অত্যন্ত সংবেদনশীল, অভিমানী এবং আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন একজন মানুষ। কষ্ট পেলেও তিনি খুব কমই তা প্রকাশ করতেন। একইসঙ্গে তিনি বলেন, মুম্বইয়ে গিয়ে ‘ছোটি সি মুলাকাত’ ছবি করতে গিয়ে উত্তম কুমার বড় ধাক্কা খেয়েছিলেন। নিজের প্রথম হিন্দি ছবির প্রযোজনায় বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছিল তাঁকে। যাঁদের তিনি বন্ধু বলে বিশ্বাস করেছিলেন, প্রয়োজনের সময়ে তাঁদের অনেকেই পাশে দাঁড়াননি। বিশ্বজিতের দাবি, সেই সময় কেউ যদি তাঁকে সঠিক পরামর্শ দিতেন, তাহলে হয়তো এত বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হতো না। তিনি এই আক্ষেপের কথাও একসময় সুপ্রিয়া দেবীকে জানিয়েছিলেন। সুপ্রিয়াও নাকি বলেছিলেন, “তোর মতো করে তোদের দাদাকে যদি কেউ ভুলটা ধরিয়ে দিত!”

বিশ্বজিৎ আরও জানান, জীবনের বিভিন্ন সময়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও পরে ভুল বলে মনে হয়েছিল উত্তমকুমারের। যেমন, রাজ কাপুরের ‘সঙ্গম’ ছবিতে অভিনয় না করা কিংবা প্রযোজক হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ছবির প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়া। প্রথম হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসক সুনীল সেন তাঁকে নিয়ম মেনে চলতে, পরিমিত খাওয়া এবং মদ্যপান নিয়ন্ত্রণ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। শুরুতে সেই নিয়ম মেনে চললেও পরে আর নিজের শরীরের প্রতি তেমন যত্নশীল ছিলেন না বলে জানান বিশ্বজিৎ। তবে সেটি আত্মহত্যার ইচ্ছা থেকে ছিল কি না, তা তিনি নিশ্চিতভাবে বলতে চাননি। তাঁর মতে, ব্যক্তিগত জীবনের নানা অশান্তি এবং মানসিক চাপও মহানায়কের জীবনে প্রভাব ফেলেছিল।

সাক্ষাৎকারে আরও একটি অজানা ঘটনার কথা জানান বিশ্বজিৎ। নকশাল আন্দোলনের সময় একদিন স্টুডিয়োর মেকআপ রুমে বসে থাকা উত্তম কুমারের সামনে মুখ ঢাকা দুই যুবক বন্দুক নিয়ে ঢুকে তাঁকে টালিগঞ্জ ছেড়ে যাওয়ার হুমকি দেয়। এরপর সুপ্রিয়া দেবী তাঁকে রাতারাতি মুম্বইয়ে বিশ্বজিতের বাড়িতে নিয়ে যান। আত্মগোপন করার জন্য তখন নিজের বিখ্যাত ‘ইউকে কাট’ চুলও কেটে ফেলেছিলেন মহানায়ক। পরে সেই ঘটনার কথা বলতে গিয়ে উত্তম কুমার নাকি বিশ্বজিৎকে বলেছিলেন, “সে দিন দুটো বাচ্চা বাচ্চা ছেলে এসে আমার বুকে বন্দুকের নল ঠেকিয়ে হুমকি দেওয়ার সাহস দেখাল! সেটা স্টুডিয়োপাড়ায়, আমার মেকআপ রুমে! কেউ সে দিন আমায় বাঁচাতে এল না। প্রতিবাদ জানাল না। টুঁ শব্দও করল না! সে দিন মরে গেলে কী হত রে? এদের জন্য আমি নিজেকে তিলে তিলে ফুরিয়ে ফেললাম!”

আরও পড়ুনঃ দু’জনের মৃ’ত্যুদিন একই মাসে, ব্যবধান মাত্র পাঁচ বছর, পর্দায় একসঙ্গে পাঁচ ছবি! বাংলা সিনেমার দর্শকদের কাছেও এই দুই শিল্পী আজও সমান আবেগের! জানেন, বাস্তবে কেমন ছিল উত্তম কুমার ও মহুয়া রায়চৌধুরীর সম্পর্ক?

এই ঘটনার স্মৃতি মনে করেই বিশ্বজিৎ বলেন, সেই দিন মহানায়কের চোখে তিনি গভীর কষ্ট, অপমান আর অভিমান একসঙ্গে দেখেছিলেন। সবশেষে বিশ্বজিৎ আবারও স্পষ্ট করে দেন, উত্তম কুমারকে নিয়ে আত্মহত্যার যে গুঞ্জন ছড়িয়েছে, তার কোনও ভিত্তি নেই। তাঁর মতে, মহানায়ক জীবনের নানা ধাক্কা, বিশ্বাসভঙ্গ, আর্থিক ক্ষতি এবং ব্যক্তিগত অশান্তির মধ্য দিয়ে গেলেও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বাঁচতে চেয়েছিলেন। চিকিৎসকের কাছে নিজের প্রাণ বাঁচানোর আবেদনই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। তাই এত বছর পরেও তাঁকে ঘিরে নানা গল্প তৈরি হলেও, যাঁরা খুব কাছ থেকে তাঁকে চিনতেন, তাঁদের বিশ্বাস একটাই, উত্তমকুমার শেষ দিন পর্যন্ত জীবনকেই আঁকড়ে ধরে রাখতে চেয়েছিলেন।

You cannot copy content of this page