অভিনেতা জিতু কমল ফের বিস্ফোরক অভিযোগ তুললেন টলিউডের অন্দরের রাজনীতি, আর্টিস্ট ফোরামের ভূমিকা এবং কিছু প্রভাবশালী অভিনেতার বিরুদ্ধে। সাম্প্রতিক এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেছেন, দীর্ঘদিন ধরে টলিউডে এমন এক ‘নেক্সাস’ কাজ করছে যেখানে চাটুকারিতা, রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা এবং গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের কারণে সাধারণ শিল্পীরা ন্যায্য সম্মান ও সাহায্য পান না। জিতুর কথায়, তিনি বহুবার আর্টিস্ট ফোরামের কাছে অভিযোগ জানিয়েও কোনও সহযোগিতা পাননি। বরং তাঁকে বারবার এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, কেন শিল্পীদের সমস্যা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বললেই তাঁকে ‘বিতর্কিত’ তকমা দেওয়া হচ্ছে।
সাক্ষাৎকারে জিতু জানান, গত ১৫ মার্চ তিনি আর্টিস্ট ফোরামকে ই-মেল করে একটি ঘটনার অভিযোগ করেছিলেন। তাঁর দাবি, তিনি ফোন, মেসেজ এবং হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও কোনও উত্তর পাননি। অথচ পরে সংবাদমাধ্যমে ফোরামের তরফে বলা হয়, সোশ্যাল মিডিয়ায় অভিযোগ না করে ফোরামে জানানো উচিত ছিল। এই বক্তব্যকে সরাসরি “মিথ্যা” বলে আক্রমণ করেন জিতু। তিনি বলেন, একজন সদস্য হিসেবে তিনি নিয়ম মেনেই অভিযোগ জানিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। তাঁর অভিযোগ, আর্টিস্ট ফোরামের অনেক সদস্য গত ১২-১৫ বছর ধরে রাজনৈতিক চাটুকারিতা করেই নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছেন এবং এখন সাধারণ শিল্পীদের পাশে দাঁড়ানোর বদলে তাঁদের চুপ করানোর চেষ্টা করছেন।
এসময় কার্যত প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়-কেও আক্রমণ করেন। জিতুর বক্তব্য, একজন সিনিয়র অভিনেতা এবং আর্টিস্ট ফোরামের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তি হিসেবে তাঁর দায়িত্ব ছিল সমস্যার কথা শোনা। কিন্তু বাস্তবে তিনি বারবার এড়িয়ে গিয়েছেন। এমনকি ১৫ মিনিট সময় দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েও শেষ পর্যন্ত কথা বলেননি বলেও অভিযোগ করেন জিতু। তিনি আরও দাবি করেন, একটি মিটিংয়ে তাঁকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হলেও সেখানে তাঁর সমস্যার সমাধান হয়নি। বরং বাইরে ভুল তথ্য ছড়ানো হয়েছে যে তিনি নাকি “ক্ষমা চাইতে” গিয়েছিলেন। জিতুর কথায়, তিনি এখনও পুরো ঘটনার ভিতরের কথা প্রকাশ করেননি শুধুমাত্র নিজের নৈতিকতার কারণে। তবে তিনি স্পষ্ট করে দেন, শিল্পীদের প্রতিবাদকে ইচ্ছাকৃতভাবে দমন করার চেষ্টা চলছে।
রাজনীতি নিয়েও বিস্ফোরক মন্তব্য করেন জিতু কমল। তাঁর অভিযোগ, টলিউড থেকে যাঁরা এমএলএ বা এমপি হয়েছেন, তাঁরা শিল্পীদের হয়ে কথা বলার বদলে উল্টে শিল্পীদেরই “চমকেছেন” ও “ধমকেছেন”। এই প্রসঙ্গে তিনি সরাসরি সায়নী ঘোষ-এর নাম তোলেন। জিতুর দাবি, তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে হুমকির ঘটনা ঘটার পর তিনি সাহায্য চাইলেও কোনও সাড়া পাননি। বরং পরে তাঁর বিরুদ্ধেই একাধিক মামলা হয়। এখানেই থেমে থাকেননি অভিনেতা। তিনি বলেন, ভোটের সময় জনপ্রিয় অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ব্যবহার করা হলেও পরে তাঁদের অনেকেই সাধারণ শিল্পীদের সমস্যার পাশে দাঁড়ান না। তাঁর মতে, বহু শিল্পী রাজনৈতিক ক্ষমতার কাছে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার জন্যই বারবার শাসক দলের কাছাকাছি থেকেছেন।
টলিউডের ভেতরে অর্থের বিনিময়ে সমস্যা “মেটানোর” অভিযোগও তুলেছেন জিতু। তাঁর দাবি, এক প্রযোজকের কাছ থেকে নাকি দেড় লক্ষ টাকা চাওয়া হয়েছিল তাঁর সঙ্গে সমস্যা মেটানোর নামে। যদিও তিনি পুরো প্রমাণ এখনই প্রকাশ করেননি, তবে জানিয়েছেন তাঁর কাছে সেই তথ্য রয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তিনি বলেন, ইন্ডাস্ট্রির ভেতরে এমন কিছু মানুষ রয়েছেন যারা সমস্যার সমাধান করার বদলে নিজেদের স্বার্থে পরিস্থিতিকে ব্যবহার করেন। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, নতুন প্রযোজক বা সাধারণ শিল্পীরা বারবার চাপে পড়ে ইন্ডাস্ট্রি ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। তাঁর মতে, টলিউডের বর্তমান সংকটের পিছনে এই গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এবং রাজনৈতিক প্রভাবই অন্যতম বড় কারণ।
আরও পড়ুনঃ “ওরা আমাকে বের করে দিয়েছিল…স্ক্রিন টেস্ট ও তিনটে শিডিউল শুট করিয়ে বলল, আমি অভিনয় পারি না” টলিউডে ‘পিআর রাজনীতি’র শি’কার হয়েছিলেন অর্জুন চক্রবর্তীও? সহ্য করতে হয়েছে অনেক অপমান? দীর্ঘদিন পর্দা থেকে দূরে, অবশেষে ফিরতেই কাদের নিশানা করলেন বর্ষীয়ান অভিনেতা?
সাক্ষাৎকারের শেষে জিতু কমল স্পষ্ট ভাষায় জানান, তিনি ভয় পান না এবং নিজের অবস্থান থেকে সরবেন না। তাঁর দাবি, তিনি “চাটুকার” নন, “ধান্দাবাজ” নন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ চালিয়ে যাবেন। তিনি আরও বলেন, শিল্পীদের উচিত সংগঠনকে স্বচ্ছ রাখা এবং যাঁদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা। একই সঙ্গে তিনি টলিউডের সিনিয়রদের উদ্দেশে আবেদন জানান, জুনিয়র শিল্পীদেরও সম্মান দেওয়া হোক এবং তাঁদের কথা গুরুত্ব দিয়ে শোনা হোক। জিতুর কথায়, “প্রতিবাদ করাটা অপরাধ নয়”, আর সেই কারণেই তিনি নিজের লড়াই চালিয়ে যেতে চান, যত চাপই আসুক না কেন।






