টলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা কৌশিক সেন দীর্ঘদিন ধরেই অভিনয়ের পাশাপাশি সমাজ, সম্পর্ক এবং মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে নিজের স্পষ্ট মতামতের জন্য পরিচিত। নাটক, সিনেমা কিংবা ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি জীবনের নানা দিক নিয়ে অকপটে কথা বলেন। সম্প্রতি ‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’ ছবির প্রচারের সময় এক সাক্ষাৎকারে বৈবাহিক সম্পর্ক, কমপ্রোমাইজ, আত্মসমালোচনা এবং সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার মূল ভিত্তি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন অভিনেতা। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে এমন কিছু দৃষ্টিভঙ্গি, যা শুধুমাত্র স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক নয়, যে কোনও দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের ক্ষেত্রেই প্রাসঙ্গিক।
সাক্ষাৎকারে কৌশিক সেন জানান, সম্পর্ক কখনওই একপাক্ষিকভাবে টিকে থাকে না। তাঁর মতে, সম্পর্কে মতের অমিল, ভুল বোঝাবুঝি কিংবা সমস্যার সৃষ্টি হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই পরিস্থিতি সামলানোর জন্য উভয় পক্ষেরই ধৈর্য, বোঝাপড়া এবং আত্মসমালোচনার মানসিকতা থাকা জরুরি। তিনি বলেন, “অনেকে বলেন কমপ্রোমাইজ করে একটা সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হয়। আমার কাছে কমপ্রোমাইজ কোনও খারাপ শব্দ নয়। বরং কমপ্রোমাইজ করাটা একটা খুব বড় গুণ।” তবে তিনি স্পষ্ট করে দেন, সব ধরনের আপস গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর কথায়, “তুমি যদি লোভের কারণে বা খারাপ কোনও উদ্দেশ্যে কমপ্রোমাইজ করো, সেটা অবশ্যই ভুল। কিন্তু যদি একটা ভালো সম্পর্ক বা ভালো কিছুকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য কমপ্রোমাইজ করো, তাহলে সেটা এক্সেলেন্ট।”
বৈবাহিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র আবেগ বা ভালোবাসাই যথেষ্ট নয় বলেও মনে করেন অভিনেতা। তাঁর মতে, সম্পর্কের পিছনে বাস্তব জীবনের নানা বিষয় কাজ করে, যার মধ্যে অর্থনৈতিক স্থিতি অন্যতম। কৌশিক সেন বলেন, “সমস্ত সম্পর্কের পেছনে একটা অর্থনীতি আছে। শুধু ভালোবাসা বা ইমোশন দিয়ে সম্পর্ককে বিচার করা যায় না। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সবকিছুর পিছনেই অর্থনৈতিক একটা ভিত্তি থাকে।” বিশেষ করে নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার গুরুত্বের উপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হওয়া একজন মহিলাকে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও আরও আত্মবিশ্বাসী এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ করে দেয়। তাঁর মতে, একটি সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারস্পরিক সম্মান ও সমান মর্যাদার পাশাপাশি আর্থিক স্বাধীনতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কৌশিক সেন আরও বলেন, যে কোনও সম্পর্কে নিজের ভুল স্বীকার করার মানসিকতা অত্যন্ত জরুরি। তাঁর মতে, অনেক সময় মানুষ নিজের অবস্থানকে একমাত্র সঠিক বলে ধরে নেয়, আর সেখান থেকেই সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয়। তিনি বলেন, “তুমি যা করছ, যা বলছ, সেটাই একমাত্র সত্য এরকম ভাবনা থেকেই সমস্যার শুরু।” অভিনেতার মতে, একজন মানুষের প্রকৃত উত্তরণ তখনই সম্ভব, যখন সে থেমে নিজের ভেতরে তাকাতে শেখে। আত্মসমালোচনার এই ক্ষমতাই মানুষকে আরও পরিণত করে এবং সম্পর্ককে নতুনভাবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। তিনি মনে করেন, অহংকার নয়, বরং বিনয় এবং একে অপরকে বোঝার ইচ্ছাই একটি সম্পর্ককে দীর্ঘস্থায়ী করে।
আরও পড়ুনঃ ‘অত্যন্ত বিদুষী ও এলিট মহিলাদের মুখে আত্মরক্ষার জন্য মেয়েদের কীভাবে পোশাক পরা উচিত শুনে ঘৃ’ণা লাগে…বারুইপুরের বাচ্চা মেয়েটি কি জামাকাপড় খুলে ঘুরছিল?’ ধ*র্ষণের কারণ হিসেবে নারীর পোশাককে কাঠগড়ায় তোলার প্রবণতা নিয়ে বি*স্ফোরক কৌশিক সেন! শুধুমাত্র ডিগ্রি অর্জন করা শিক্ষা নয়, সমাজকে কী বার্তা দিলেন অভিনেতা?
নিজের বক্তব্যের শেষে কৌশিক সেন বলেন, কোনও সম্পর্ককে শুধুমাত্র আবেগের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে চলবে না। ভালোবাসার পাশাপাশি বিশ্বাস, সম্মান, পারস্পরিক সহযোগিতা, আত্মসমালোচনা এবং প্রয়োজনে ইতিবাচক কমপ্রোমাইজ এই কয়েকটি বিষয়ই একটি সম্পর্ককে সুস্থ ও স্থায়ী করে তোলে। তাঁর মতে, সম্পর্কে জয়-পরাজয়ের লড়াই নয়, বরং একসঙ্গে এগিয়ে চলার মানসিকতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সময়ে যখন সম্পর্ক ভাঙার ঘটনা ক্রমশ বাড়ছে, তখন কৌশিক সেনের এই মন্তব্য অনেকের কাছেই নতুন করে ভাবনার খোরাক জোগাতে পারে।






