রুপোলি পর্দায় তিনি ছিলেন বাংলা সিনেমার চিরকালীন মহানায়ক। অসংখ্য জনপ্রিয় ছবি, রাজকীয় ব্যক্তিত্ব আর অনবদ্য অভিনয়ের জন্য আজও তিনি দর্শকদের মনে অমলিন। কিন্তু ক্যামেরার বাইরে উত্তম কুমারের ব্যক্তিগত জীবন ছিল একেবারেই আলাদা। পেশাগত সাফল্যের পাশাপাশি জীবনের নানা টানাপোড়েন, সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক, ভবানীপুরের বাড়ি ছেড়ে ময়রা স্ট্রিটে চলে আসা কিংবা সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ পথচলা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। তবুও নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি তিনি কখনও প্রকাশ্যে আনতে চাননি। বরং সব কথা তিনি লিখে রাখতেন একটি বিশেষ লাল রঙের ব্যক্তিগত ডায়েরিতে, যার কথা খুব কম মানুষই জানতেন।
উত্তম কুমারের ছোট ভাই এবং অভিনেতা তরুণ কুমার পরে জানিয়েছিলেন, মহানায়কের ডায়েরি লেখার অভ্যাস ছিল নিয়মিত। কাজের হিসাব, শুটিং কিংবা বিভিন্ন অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেখার জন্য আলাদা ডায়েরি থাকলেও, একটি লাল ডায়েরি ছিল শুধুই তাঁর ব্যক্তিগত অনুভূতির জন্য। দিনের কাজ শেষ করে তিনি প্রায় প্রতিদিন কিছুটা সময় সেই ডায়েরি লিখতেন। সেখানে বাইরের চাকচিক্যের বদলে জায়গা পেত তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত ভাবনা, মানসিক চাপ, কষ্ট এবং জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতা। এক সাক্ষাৎকারে উত্তম কুমার নিজেও এই ব্যক্তিগত ডায়েরির অস্তিত্বের কথা স্বীকার করেছিলেন।
তবে সেই ডায়েরি নিয়ে তাঁর একটি স্পষ্ট ইচ্ছাও ছিল। তিনি চাননি, মৃত্যুর পর তাঁর ব্যক্তিগত লেখা মানুষের সামনে চলে আসুক বা বই আকারে প্রকাশিত হোক। তাই জীবিত অবস্থাতেই তরুণ কুমারকে বলে গিয়েছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পরে যেন সেই লাল ডায়েরি নষ্ট করে দেওয়া হয়। কারণ তাঁর বিশ্বাস ছিল, জীবনের দুর্বলতা, হতাশা বা ব্যক্তিগত যন্ত্রণা জনসমক্ষে আলোচনার বিষয় হওয়া উচিত নয়। নিজের ব্যক্তিগত পৃথিবীকে তিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে চেয়েছিলেন।
পরে তরুণ কুমার তাঁর স্মৃতিচারণে লিখেছিলেন, দাদার মানসিক কষ্ট তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। সেই সময় উত্তম কুমার একদিন গভীর হতাশায় বলেছিলেন, “আমি ভালো নেই রে! মনে বিন্দুমাত্র শান্তি নেই। বুঝতে পারছি না কী করব… আমার নিজেরও তো একটা ব্যক্তিগত পৃথিবী আছে, সেখানে সবাই কেন অন্যায়ভাবে ঢুকে পড়বে? আমার স্ত্রী, সন্তান, পরিবারকে আমি অন্যদের সঙ্গে এক করে দেখতে পারি না। এই মারাত্মক মানসিক চাপ আর সহ্য হচ্ছে না… আমি মুক্তি চাই, মুক্তি!” সেই কথার উত্তরে তরুণ কুমার তাঁকে বলেছিলেন, “এখন আর সেটা সম্ভব নয় রে দাদা। নিজের তৈরি করা জালের ভেতরে তুই নিজেই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়েছিস। তোর আর মুক্তি নেই।” এই কথোপকথন থেকেই বোঝা যায়, খ্যাতির আড়ালে তিনি কতটা মানসিক চাপে ভুগছিলেন।
আরও পড়ুনঃ “সাদা কাপড়ে র’ক্তের দাগ দেখিয়েছিল, কুৎসিত ষড়য’ন্ত্রের শিকার হয়েও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীদের অন্যতম স্বচ্ছ মানুষ!” রাজনৈতিক কৌশলের বলি, সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের গু’লি কাণ্ডে ইচ্ছাকৃতভাবে ফাঁসানো হয়েছিল তৎকালীন সিপিএম মুখ্যমন্ত্রীকে, অভিযোগ সব্যসাচী চক্রবর্তীর! ‘বাজে পাবলিসিটি’ নিয়ে আলোচনায় টানলেন মমতাকেও, আর কী বললেন অভিনেতা?
গুঞ্জন রয়েছে, ১৯৮০ সালে উত্তম কুমারের মৃত্যুর পর তাঁর সেই রহস্যময় লাল ডায়েরিটি আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়। তবে ঠিক কে বা কারা সেই ডায়েরি নষ্ট করেছিলেন, তা আজও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। ফলে এই ঘটনাকে ঘিরে রহস্য আজও অমীমাংসিত। মহানায়কের ব্যক্তিগত জীবনের বহু অজানা অনুভূতি হয়তো সেই ডায়েরির পাতাতেই চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেছে। তাই বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এই লাল ডায়েরির গল্প এখনও সমান কৌতূহলের বিষয় হয়ে রয়েছে।






