“এক সেকেন্ডের অসাবধানতাতেই বদলে গিয়েছিল পুরো জীবন”, মঞ্চ থেকে পড়ে গু’রুতর চো’ট পান, তারপর ৭ বার অস্ত্র’পচার! আজও তীব্র শারীরিক য’ন্ত্রণা নিয়েই প্রতিদিন লড়াই করে চলেছেন মধুবন্তী মৈত্র! এত কষ্টের পরেও কীভাবে মানসিক ভাবে নিজেকে শক্ত রাখেন তিনি?

বাংলা সংস্কৃতি জগতের পরিচিত মুখ মধুবন্তী মৈত্র। একাধারে তিনি বাচিক শিল্পী, সংগীতশিল্পী, অধ্যাপিকা এবং জনপ্রিয় কণ্ঠস্বরের অধিকারী। দীর্ঘদিন ধরে তাঁর কণ্ঠ শুনে বড় হয়েছে একাধিক প্রজন্ম। মেট্রোর ঘোষণার গলা হোক কিংবা মঞ্চ সঞ্চালনা, সব ক্ষেত্রেই তিনি নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছেন। সম্প্রতি এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে নিজের ব্যক্তিগত জীবন, সংগ্রাম, পরিবার, কেরিয়ার এবং শারীরিক লড়াই নিয়ে অকপট কথা বললেন মধুবন্তী। তিনি জানিয়েছেন, আজও প্রতিদিন ৫৫ থেকে ৬০টি কুকুর-বিড়ালকে খাওয়ানোর দায়িত্ব তাঁর কাঁধে। শুধু খাওয়ানো নয়, তাদের চিকিৎসা থেকে দেখাশোনা সবটাই নিজের হাতে সামলান তিনি। সেই কারণেই তাঁর সংসার শুধু চার দেওয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং আরও অনেক বড়।

সাক্ষাৎকারে মধুবন্তী জানান, ছোটবেলা থেকেই তাঁর জীবনে পড়াশোনা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাঁর মা ছিলেন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা। সেই পরিবেশ থেকেই পড়াশোনার প্রতি টান তৈরি হয়। প্রেসিডেন্সি কলেজে ইংরেজি নিয়ে পড়াশোনা থেকে শুরু করে অধ্যাপনার জগতে প্রবেশ সবটাই হয়েছে কোনও নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়াই। পরে দূরদর্শন থেকে ডাক আসে, শুরু হয় সঞ্চালনা এবং বাচিক শিল্পীর পথচলা। মেট্রোর ঘোষণার গলা হিসেবে জনপ্রিয়তা পাওয়ার অভিজ্ঞতাও ভাগ করে নেন তিনি। নিজের গলা প্রথমবার টেপ রেকর্ডারে শুনে নাকি খুবই অবাক হয়েছিলেন মধুবন্তী। তাঁর মনে হয়েছিল, এত খারাপ গলা নিয়ে তিনি কীভাবে মাইকে কথা বলবেন! কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই কণ্ঠই হয়ে ওঠে বাংলা সংস্কৃতি জগতের অন্যতম পরিচিত স্বর।

একইসঙ্গে মধুবন্তী মৈত্র তুলে ধরেছেন তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ের কথাও। ২০০২ সালে আইটিসি সোনার বাংলা হোটেলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সঞ্চালনা করতে গিয়ে মঞ্চ থেকে নামার সময় অন্ধকারে গ্রানাইটের উপর পড়ে গিয়ে ভেঙে যায় তাঁর পা। সেই দুর্ঘটনার পর থেকে আজও চলছে তাঁর শারীরিক লড়াই। সাতবার অস্ত্রোপচার হয়েছে তাঁর পায়ে। একসময় হাড়ে মারাত্মক সংক্রমণও হয়েছিল। দীর্ঘদিন হাসপাতালে কাটাতে হয়েছে তাঁকে। এখনও প্রতিদিন তীব্র যন্ত্রণা নিয়েই হাঁটতে হয়। তবুও থেমে যাননি তিনি। বরং সেই কষ্টকেই জীবনের অংশ হিসেবে মেনে নিয়েছেন। মধুবন্তীর কথায়, জীবনে আফসোস করে কোনও লাভ নেই। যা হয়েছে, সেটাকে মেনে নিয়েই সামনে এগোতে হয়।

পরিবারের প্রসঙ্গেও একাধিক ব্যক্তিগত কথা বলেন তিনি। অভিনেত্রী অনুষা বিশ্বনাথনের মা হিসেবে মেয়ের অভিনয় নিয়ে গর্বিত মধুবন্তী। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, তিনি বা তাঁর স্বামী অশোক বিশ্বনাথন কেউই চাননি অনুষা অভিনয় জগতে আসুক। কারণ এই ইন্ডাস্ট্রির অনিশ্চয়তা তাঁদের সবসময় চিন্তায় রাখে। তবুও অনুষার প্রতিভা নিয়ে তাঁর কোনও সন্দেহ নেই। মেয়ের অভিনয় দক্ষতার প্রশংসা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ক্যামেরার সামনে চরিত্রে ঢুকে যাওয়ার ক্ষমতা অনুষার অসাধারণ। একইসঙ্গে সাম্প্রতিক সম্পর্ক ও ব্যক্তিগত জীবনের বিতর্ক নিয়েও মুখ খুলেছেন মধুবন্তী। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে দুই পরিবারের সম্পর্কের কোনও ভাঙন ধরেনি। বরং সবাই নিজেদের জায়গা থেকে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করছেন।

আরও পড়ুনঃ “পরিবর্তন আমার জীবনে পাঁচ বছর আগেই…” ছেলেকে কোলে নিয়ে আবেগঘন পোস্ট সোনালী চৌধুরীর! সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে কেন চিন্তিত? সামনে এল, অভিনেত্রীর জীবনের কোন অজানা গল্প?

বর্তমান প্রজন্ম ও সোশ্যাল মিডিয়ার পরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মধুবন্তী মৈত্র। তাঁর মতে, এখনকার তরুণ প্রজন্ম খুবই সংবেদনশীল এবং সহজ-সরল। তাই তাঁদের নিয়ে তাঁর ভয়ও বেশি। সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষের অতিরিক্ত বিচারপ্রবণ মানসিকতা তাঁকে কষ্ট দেয়। বিশেষ করে কোনও কঠিন পরিস্থিতিতে থাকা মানুষকে নিয়ে কটাক্ষ বা সমালোচনা তিনি মেনে নিতে পারেন না। জীবনের নানা কঠিন অভিজ্ঞতা তাঁকে শিখিয়েছে, প্রত্যেক মানুষের কষ্টের গল্প আলাদা। তাই অন্যকে বিচার না করে পাশে দাঁড়ানোই সবচেয়ে জরুরি। সাক্ষাৎকারের শেষে দর্শক ও অনুরাগীদের উদ্দেশে মধুবন্তীর বার্তা, শুধু মানুষ নয়, মানুষের বাইরেও যেসব প্রাণী কষ্টে আছে, তাদের প্রতিও ভালোবাসা এবং সহানুভূতি ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা উচিত।

You cannot copy content of this page