মেয়ের প্রেম ও বিয়ে নিয়ে এবার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে পরামর্শ দিলেন প্রবীণ অভিনেত্রী মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়। ‘বালিকা বধূ’ ছবির হাত ধরে মাত্র অল্প বয়সেই অভিনয় জগতে পরিচিতি পেয়েছিলেন তিনি। ১৯৬৭ সালে মুক্তি পাওয়া সেই ছবি তাঁকে রাতারাতি দর্শকের কাছে পরিচিত করে তোলে। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১২ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে। ছবির সাফল্যের পরই হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ছেলে জয়ন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর বিয়ে ঠিক হয়। খুব কম বয়সেই বিয়ের পাশাপাশি সংসার ও মাতৃত্বের দায়িত্বও সামলাতে হয়েছিল তাঁকে। নিজের সেই জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই বর্তমান প্রজন্মের মেয়েদের জন্য বেশ কিছু কথা বলেছেন অভিনেত্রী।
২০২৬ সালের জাগরণ চলচ্চিত্র উৎসবে নয়নদীপ রক্ষিতের সঙ্গে আলাপচারিতায় নিজের জীবন এবং বর্তমান প্রজন্ম নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন মৌসুমী। নিজেকে প্রগতিশীল মনে করেন জানিয়ে তিনি ছোট মেয়ে মেঘা মুখোপাধ্যায়কেও নিজের মতো করে ভাবতে বলেছেন। মেয়ের প্রেমের প্রসঙ্গে অভিনেত্রীর বক্তব্য, ভালোবাসার সম্পর্ক থাকলেই সেই মানুষকেই বিয়ে করতে হবে এমন কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। তাঁর কথায়, “তুমি প্রেমিক রাখতে পারো, কিন্তু সেই মানুষটিকেই যে বিয়ে করতে হবে, এমন কোনও কথা নেই।” শুধু মেয়ের জন্য নয়, অনুষ্ঠানে উপস্থিত অন্য মহিলাদেরও নিজের জীবন নিয়ে একটু বেশি ভাবার পরামর্শ দেন তিনি। মৌসুমীর মতে, সময় অনেক বদলে গিয়েছে এবং মেয়েদের নিজেদের প্রয়োজন ও ইচ্ছাকেও গুরুত্ব দেওয়া দরকার। সেই কারণেই তিনি মেয়েদের নিজের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সচেতন হওয়ার কথা বলেছেন।
সমাজের পরিবর্তনের কথাও উঠে আসে মৌসুমীর আলোচনায়। তাঁর মতে, আগের তুলনায় মেয়েরা অনেকটাই এগিয়ে গেলেও এখনও বহু পরিবারে মেয়েদের শ্বশুরবাড়ির দায়িত্ব সামলানোর জন্য তৈরি করা হয়। অন্যদিকে ছেলেদের একইভাবে সংসারের কাজ শেখানো হয় না বলেই মনে করেন তিনি। এই প্রসঙ্গে অভিনেত্রীর বক্তব্য, “আমরা মেয়েদের শেখাই শ্বশুরবাড়ির দেখাশোনা করতে, কিন্তু ছেলেদের সেইভাবে ঘরের কাজ শেখাই না।” তাঁর মতে, সংসারের কাজ শুধু মহিলাদের দায়িত্ব, এমন ধারণা বদলানো প্রয়োজন। বর্তমান প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের উপর মানসিক চাপও আগের তুলনায় বেড়েছে বলে মনে করেন তিনি। নিজেদের জন্য সময় না বের করতে পারার কারণে অনেকেই জীবনের আনন্দ ঠিকভাবে উপভোগ করতে পারছেন না বলেও মন্তব্য করেছেন মৌসুমী।
জীবনে ভুল হওয়া স্বাভাবিক, তবে একই ভুল বারবার না করার পরামর্শও দিয়েছেন অভিনেত্রী। কাউকে কিছু প্রমাণ করার জন্য নিজের কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয় বলেই মনে করেন তিনি। নিজের বয়সের কথাও উল্লেখ করে মৌসুমী জানিয়েছেন, এখন তাঁর বয়স ৭০ বছর এবং এই বয়সে দাঁড়িয়ে নিজের পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা আরও স্পষ্টভাবে বুঝেছেন। তাঁর বক্তব্য, “যা করতে ভালো লাগে, করো। তবে কোনও কিছুতেই বাড়াবাড়ি কোরো না।” একইসঙ্গে তিনি বলেছেন, “একবার ভুল করলে সেই ভুল দ্বিতীয়বার কোরো না।” নিজের জীবনেও ভুল করেছেন বলে স্বীকার করে অভিনেত্রী জানিয়েছেন, কোনও কাজ ঠিক হয়নি বুঝতে পারলে তিনি সেই ভুল আর করেননি। মানুষের বিবেক থাকলেও অনেক সময় আমরা নিজেদের কাজ বা সিদ্ধান্ত নিয়ে সেভাবে বিচার করি না বলেও মনে করিয়ে দিয়েছেন তিনি।
ব্যক্তিগত জীবনের কথা বলতে গিয়ে মেয়েকে হারানোর গভীর যন্ত্রণার কথাও ফের উঠে আসে মৌসুমীর আলোচনায়। ২০১৯ সালে তাঁর বড় মেয়ে পায়েল মারা যান। দীর্ঘদিন ডায়াবেটিসের সঙ্গে লড়াই করার পর প্রায় দু’বছর কোমায় ছিলেন তিনি। সেই সময় মেয়ের চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ তুলেছিলেন মৌসুমী তাঁর স্বামী এবং শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের বিরুদ্ধে। এমনকি মেয়ের সঙ্গে দেখা করতেও তাঁকে বাধা দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছিলেন অভিনেত্রী। ২০১৮ সালে পায়েলের অভিভাবক হিসেবে তাঁকে নিয়োগ করার আবেদন জানিয়ে বম্বে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থও হয়েছিলেন তিনি। মেয়ের চিকিৎসা ও সেই সময়ের পরিস্থিতি নিয়ে করা তাঁর অভিযোগগুলিও তাঁর জীবনের সেই কঠিন অধ্যায়ের অংশ হয়ে রয়েছে।
আরও পড়ুনঃ “ঠিকমতো খেলাটা বুঝতে পারার আগেই…বড্ড তাড়াতাড়িই ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হল!” “বাইরে থেকে মানুষ চেনা যায় না, কিন্তু একটাই আক্ষেপ থেকে গেল…” বিগ বসের ঘর থেকে বেরিয়েই সায়কের বি*স্ফোরক মন্তব্য! এই তিন সপ্তাহ ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম কঠিক অধ্যায়? আর কী বললেন অভিনেতা?
মেয়েকে হারানোর সেই শোক এখনও তাঁর এবং স্বামী জয়ন্ত মুখোপাধ্যায়ের জীবন থেকে মুছে যায়নি বলেই জানিয়েছেন মৌসুমী। নয়নদীপ রক্ষিতের সঙ্গে আগের এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, এই শূন্যতা তাঁদের সারা জীবন বয়ে নিয়ে চলতে হবে। তাঁর কথায়, “আমার মনে হয় না, আমার স্বামী এখনও পুরোপুরি পায়েলের মৃত্যু থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে। আমিও পারিনি।” তিনি আরও জানিয়েছিলেন, কোনও সন্তানকে হারানোর পর সেই দুঃখ থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়। বয়সের ব্যবধান আট বছর হওয়ায় ছোট বোন মেঘার প্রতি পায়েলের মায়ের মতোই স্নেহ ছিল বলেও জানান অভিনেত্রী। মেয়েকে হারানোর পর সেই শূন্যতা তাঁদের পরিবারে কতটা গভীর, তা বোঝাতে মৌসুমী জানান, “অনেক সময় জয়ন্ত রাতে উঠে পায়েলের নাম ধরে চিৎকার করত।” এই যন্ত্রণাকে কোনও শব্দ দিয়ে সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করা যায় না বলেও জানিয়েছেন তিনি।






