পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছে রাজ্যবাসী। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের অবসান ঘটিয়ে নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। তবে সরকার পরিবর্তনের পরও রাজনৈতিক বিতর্ক, অভিযোগ-প্রত্যাঘাত এবং পুরনো সরকারের কার্যকলাপ নিয়ে আলোচনা থামেনি। চাকরি দুর্নীতি, শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারি, কয়লা পাচার, গরু পাচার থেকে শুরু করে একাধিক বিতর্কে বারবার শিরোনামে এসেছে তৃণমূল সরকার। সেই প্রভাব যে শুধুমাত্র রাজনীতির ময়দানেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং বাংলা বিনোদন জগতেও তার প্রভাব পড়েছিল, এমন অভিযোগও বহুবার উঠেছে। ঠিক এই আবহেই মুখ খুলেছেন টেলিভিশন জগতের পরিচিত মুখ অভিনেতা অর্ণব বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিনেত্রী ময়না বন্দ্যোপাধ্যায়। সরকার বদলের পরও কেন তাঁরা তৃণমূল কংগ্রেস এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে রয়েছেন, সেই প্রশ্নেরই জবাব দিয়েছেন তাঁরা।
সাক্ষাৎকারে ময়না বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আমি যদি ভালো সময়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরতে পারি, তাহলে খারাপ সময়ে কেন থাকব না?” তাঁর মতে, রাজনৈতিক আদর্শ কোনও ক্ষমতার সঙ্গে ওঠানামা করে না। তিনি জানান, একজন মানুষের জীবনে যেমন আদর্শ গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই রাজনৈতিক অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর কথায়, “আজ আমি তৃণমূল কংগ্রেসের সমর্থক হয়ে নিজেকে দেখি। কাল ক্ষমতা চলে গেলে অন্য দলের হয়ে দাঁড়ালে আমি নিজের কাছেই ছোট হয়ে যাব।” ময়না আরও বলেন, তাঁর ১২ বছরের ছেলের কাছে তিনি এমন শিক্ষা দিতে চান না যে সুযোগ বুঝে রং বদলাতে হয়। তাই দল ক্ষমতায় থাকুক বা বিরোধী আসনে, তিনি একই অবস্থানে থাকবেন বলেই দাবি করেন।
তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গেও নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন এই তারকা দম্পতি। ময়নার দাবি, “অনেক অভিযোগ উঠেছে ঠিকই, কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ব্যক্তিগতভাবে কোনও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, এমন প্রমাণ কেউ দেখাতে পারেনি।” একই সুর শোনা যায় অর্ণবের গলাতেও। তিনি বলেন, “আমরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখে দল করেছি। তাঁর আদর্শে বিশ্বাস করেই এই পথ চলা।” অর্ণবের বক্তব্য, কোনও বড় দলে ভালো-মন্দ দুই ধরনের মানুষই থাকে। তাই দলের কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো ঠিক নয়। তিনি বলেন, “কোনও নেতা কখনও চাইবেন না তাঁর দলের বদনাম হোক। কিন্তু দল বড় হলে ভালো-খারাপ সব মানুষই সেখানে আসে।”
সরকার বদলের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় মমতা ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমর্থকদের নিয়ে যে প্রবল ট্রোলিং চলছে, তা নিয়েও মুখ খুলেছেন অর্ণব ও ময়না। অনেকেই কটাক্ষ করে তাঁদের ‘চটি চাটুকার’ বলছেন, কিন্তু সেই সমালোচনাকে গুরুত্ব দিতে নারাজ তাঁরা। ময়নার কথায়, “আমাদের কোনও চাওয়া-পাওয়া ছিল না, এখনও নেই। আমরা দল থেকে কিছু চাইনি, কিছু পাইওনি।” অন্যদিকে অর্ণব দাবি করেন, যদি শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিচয় দেখেই কাজ দেওয়া হত, তাহলে তাঁদের দীর্ঘদিন কাজের জন্য অপেক্ষা করতে হত না। তিনি বলেন, “আমার স্ত্রীকে ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত কাজ পেতে বেগ পেতে হয়েছে। আমাকেও ২০২৪ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত প্রায় বসে থাকতে হয়েছে। তাহলে আমরা কোথায় বিশেষ সুবিধা পেলাম?” তাঁদের বক্তব্য, নিঃস্বার্থভাবে দলকে সমর্থন করার কারণেই তাঁরা আজও সেই অবস্থানে রয়েছেন।
বিনোদন জগতের অন্দরমহলেও যে অন্য ধরনের রাজনীতি কাজ করে, সেই অভিযোগও তুলেছেন অর্ণব বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, রাজনৈতিক দলের রং নয়, বরং কমিশন এবং গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের রাজনীতি শিল্পীদের বেশি ক্ষতি করে। অর্ণব বলেন, “যারা অভিনয়ে দক্ষ, তাদের অনেক সময় কাজ দেওয়া হয় না। বরং কম পারিশ্রমিকের শিল্পীদের সুযোগ দেওয়া হয়, কারণ সেখানে কমিশন পাওয়া সহজ।” তাঁর অভিযোগ, ২০২৩ সাল থেকে তিনি নিজে এই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত শিল্পীদের হাতে খুব কম কাজ পৌঁছায়। তিনি মনে করেন, বাংলা ইন্ডাস্ট্রিতে কাজের পরিবেশ উন্নত হওয়া জরুরি এবং নতুন সরকারের কাছে তাঁর একটাই প্রত্যাশা যোগ্যতার ভিত্তিতে সবাই যেন সমান সুযোগ পান।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন ময়না। তিনি বলেন, “সবাই ওনাকে দিদি বলে, কিন্তু আমার কাছে উনি মা।” ময়নার দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অত্যন্ত স্নেহশীল এবং মানুষের প্রতি যত্নশীল একজন মানুষ। একটি ঘটনার উল্লেখ করে তিনি বলেন, একটি রাজনৈতিক কর্মসূচির শেষে মুখ্যমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে খোঁজ নিয়েছিলেন সকলে নিরাপদে বাড়ি ফিরেছেন কি না। অন্যদিকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে ময়নার মন্তব্য, “মানুষটা যে কথা বলে, সে কথার দাম রাখে।” বর্তমানে অভিষেককে ঘিরে নানা সমালোচনা হলেও, তিনি মনে করেন অনেকেই পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেদের অবস্থান বদলাচ্ছেন। তাঁর প্রশ্ন, “যদি তৃণমূল আবার ক্ষমতায় ফিরত, তাহলে কি আজ যারা অভিষেককে আক্রমণ করছেন, তাঁরাই আবার পাশে দাঁড়াতেন না?”
আরও পড়ুনঃ “আমার স্বামী যদি আগের স্ত্রীর কাছে ফিরে যায়…” দ্বিতীয় বিয়ের পরেও স্বামীর বাড়িতে প্রাক্তন স্ত্রীর আসা-যাওয়া, নিরাপত্তাহীনতা থেকে সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে অকপট কনীনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়! খোলামেলা স্বীকারোক্তিতে নিজের জীবনের কোন অজানা দিক সামনে আনলেন অভিনেত্রী?
নতুন সরকারকে নিয়েও আশাবাদী অর্ণব ও ময়না। তাঁদের মতে, মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে কোনও সরকারের মূল্যায়ন করা ঠিক নয়। অর্ণব বলেন, “এখন সরকারের হানিমুন পিরিয়ড চলছে। ছয় মাস বা এক বছর সময় দিতে হবে।” তিনি আরও জানান, নতুন সরকার যদি সত্যিই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী রাজনৈতিক পরিচয় নয়, যোগ্যতার ভিত্তিতে কাজের সুযোগ দেয়, তাহলে সেটি শিল্পীদের জন্য ইতিবাচক হবে। তবে একইসঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দেন, কন্যাশ্রী, লক্ষ্মীর ভান্ডার, সবুজ সাথীর মতো প্রকল্পগুলি নতুন সরকারও চালিয়ে যাচ্ছে, যা প্রমাণ করে এই প্রকল্পগুলি সাধারণ মানুষের উপকারে এসেছে। সব মিলিয়ে সরকার বদলের পর যখন বহু তারকা নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান বদলাচ্ছেন, তখন অর্ণব ও ময়না বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য স্পষ্ট তাঁরা এখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আদর্শে বিশ্বাসী এবং সমালোচনা, ট্রোল বা বিতর্কের মধ্যেও নিজেদের অবস্থান থেকে একচুলও সরতে রাজি নন।






