মাসের পর মাস কোমায় থেকে মৃ’ত্যুর অপেক্ষা! মাত্র ১৪ বয়সে বিয়ের পিঁড়িতে, এক সময় উত্তম কুমারের নায়িকা হওয়ার প্রস্তাব পেয়েছিলেন স্বর্ণযুগের এই অনবদ্য অভিনেত্রী! কিন্তু শেষ পর্যন্ত কী এমন ঘটেছিল যে সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই করুণ পরিণতি হল ললিতা চট্টোপাধ্যায়ের? জানলে চোখে আসবে জল!

বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগের বহু তারকার জীবন আজও সাধারণ মানুষের কাছে অজানা। পর্দায় তাঁদের সাফল্য, ব্যক্তিগত জীবনের সংগ্রাম এবং অভিনয় জগতের নানা না-বলা গল্প এখনও সমানভাবে আগ্রহের বিষয়। এমনই একজন অভিনেত্রী ছিলেন ললিতা চ্যাটার্জি। যিনি একদিকে যেমন নিজের অভিনয় দক্ষতায় দর্শকদের মন জয় করেছিলেন, অন্যদিকে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনও ছিল নানা উত্থান-পতনে ভরা। মহানায়ক উত্তম কুমারের কাছ থেকে নায়িকা হওয়ার প্রস্তাব পাওয়া থেকে শুরু করে একাধিক জনপ্রিয় ছবিতে অভিনয় তাঁর জীবন যেন এক চলচ্চিত্রের গল্প।

ললিতা চ্যাটার্জির জন্ম ১৯৩৭ সালের ১২ সেপ্টেম্বর। পরিবারের কাছে তাঁর ডাকনাম ছিল রুনু। মাত্র চার বছর বয়সে তিনি তাঁর মাকে হারান। বাবা কালীচরণ চট্টোপাধ্যায়ের স্নেহে বড় হয়ে ওঠেন তিনি। সাত ভাইবোনের মধ্যে ললিতাই ছিলেন সবচেয়ে ছোট। ছোটবেলা থেকেই শিল্প-সংস্কৃতির পরিবেশে বেড়ে ওঠায় অভিনয় এবং গানের প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। মাত্র আট বছর বয়সে তিনি প্রথমবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান। ‘অনন্যা’ ছবিতে তিনি কিংবদন্তি অভিনেত্রী কানন দেবীর ছোটবেলার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। মাত্র দশ বছর বয়স থেকেই তিনি রেডিওতে গান গাইতে শুরু করেন।

পরবর্তীকালে পড়াশোনার জন্য ইংল্যান্ডে গেলেও দেশে ফিরে খুব অল্প বয়সেই তাঁর বিয়ে হয়ে যায়। মাত্র ১৪-১৫ বছর বয়সে সোমু মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন ললিতা চ্যাটার্জি। তাঁদের দুই পুত্র সন্তান ছিল। তবে জীবনের অন্যতম বড় আঘাত আসে যখন তাঁর বড় ছেলে প্রদীপ খুব অল্প বয়সেই মারা যায়। সংসারের দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি তিনি নিজের পড়াশোনাও চালিয়ে গিয়েছিলেন। লেখাপড়ায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। ব্যক্তিগত জীবনের নানা চ্যালেঞ্জের মাঝেও তিনি কখনও নিজের স্বপ্নকে বিসর্জন দেননি। অভিনয়ের প্রতি তাঁর ভালোবাসা বরাবরই অটুট ছিল।

উত্তম কুমারের প্রতি তাঁর ভক্তি থেকেই জীবনের অন্যতম বড় সুযোগটি আসে। অভিনেত্রী কাবেরী বসুর সঙ্গে ‘রায়কমল’ ছবির শুটিং দেখতে গিয়ে মহানায়কের সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয় হয়। সেখানেই উত্তম কুমার তাঁকে নায়িকা হওয়ার প্রস্তাব দেন। পরবর্তীকালে ১৯৬৪ সালে ‘বিভাস’ ছবিতে উত্তম কুমারের বিপরীতে অভিনয় করে তিনি দর্শকদের নজর কাড়েন। এরপর ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’, ‘জয়জয়ন্তী’, ‘মেমসাহেব’ এবং ‘হার মানা হার’-এর মতো একাধিক জনপ্রিয় ছবিতে তিনি অভিনয় করেন। বাংলা ছবির পাশাপাশি হিন্দি সিনেমা এবং যাত্রাপালাতেও তাঁর অভিনয় ছিল প্রশংসিত।

আরও পড়ুনঃ “বাবা বছরে দু’বার মসজিদে গিয়ে নমাজ পড়তেন শুধু ইদের দিনই, কিন্তু প্রতিদিন মায়ের ঠাকুরঘরে প্রণাম না করে ঘরে ঢুকতেন না!” উস্তাদ রাশিদ খানের ছেলে আরমানের হৃদয়ছোঁয়া স্মৃতিচারণ ভাইরাল! স্ত্রী হিন্দু হলেও ধর্মচারণে বাধা দেননি, বরং অংশ নিতে নিজেও! প্রকাশ্যে প্রয়াত শিল্পীর ব্যক্তিগত জীবন ও মানবিকতার বিরল তথ্য! অজানা অধ্যায় সামনে আসতেই নতুন করে আবেগে ভাসলেন অনুরাগীরা!

ব্যক্তিগত জীবনেও ললিতা চ্যাটার্জির গল্প ছিল বেশ নাটকীয়। প্রথম স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর যাত্রাপালায় অভিনয়ের সময় পাহাড়ি ভট্টাচার্যের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় এবং পরে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের বিয়েতে সাক্ষী ছিলেন স্বয়ং উত্তম কুমার। যদিও সেই সম্পর্কও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। পরবর্তীকালে তিনি লিভ-ইন সম্পর্কে ছিলেন। জীবনের শেষ পর্বেও অভিনয় ছাড়েননি তিনি। ‘শূন্য অঙ্ক’, ‘ইচ্ছে’ এবং ‘জোনাকি’-র মতো ছবিতে কাজ করেছেন। ২০১৮ সালের ৯ মে সেরিব্রাল স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে কোমায় চলে যাওয়ার পর তাঁর মৃত্যু হয়। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ললিতা চ্যাটার্জি আজও এক উজ্জ্বল নাম, যাঁর জীবন সংগ্রাম এবং সাফল্যের কাহিনী নতুন প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণার।

You cannot copy content of this page