হাসপাতালে দেড় মাস মৃ’ত্যুর সঙ্গে লড়াই, তবু একবারও দেখতে আসেননি স্ত্রী-মেয়ে! কথা বলার শক্তিও ছিল না! কী এমন ঘটেছিল তাঁর জীবনে, যে শেষে সময়ে সবচেয়ে আপন মানুষগুলোকেও পাশে পাননি তিনি? চার দশকের জনপ্রিয় অভিনেতা, শেষ জীবনের নিঃসঙ্গতার গল্প আজও চোখে জল আনে! মনে পড়ে পার্থসারথী দেবকে?

বাংলা বিনোদন জগতের বহু শিল্পীর জীবন আলো-ঝলমলে পর্দার আড়ালে লুকিয়ে থাকে নিঃসঙ্গতা, সংগ্রাম এবং না বলা অনেক গল্প। দর্শকরা তাঁদের অভিনয়কে মনে রাখেন, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনের সুখ-দুঃখ কিংবা শেষ জীবনের লড়াই অনেক সময় সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালেই থেকে যায়। এমনই এক শিল্পী ছিলেন অভিনেতা পার্থসারথী দেব। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলা চলচ্চিত্র, থিয়েটার এবং টেলিভিশনের জগতে নিজের অভিনয় প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গিয়েছেন তিনি। অথচ তাঁর শেষ জীবনের নিঃসঙ্গতা এবং শারীরিক যন্ত্রণা সম্পর্কে অনেকেই আজও জানেন না।

বাংলা চলচ্চিত্রের একজন দক্ষ চরিত্রাভিনেতা হিসেবে পার্থসারথী দেব ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়। চরিত্রকে নিজের অভিনয় দক্ষতায় জীবন্ত করে তোলার এক অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর। ছোট থেকে বড় সব ধরনের চরিত্রেই তিনি ছিলেন সমান সাবলীল। বাংলা থিয়েটারের মঞ্চে যেমন তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়েছে, তেমনই বড় পর্দা এবং ছোট পর্দাতেও তিনি দর্শকদের মন জয় করেছেন। একাধিক প্রজন্মের দর্শক তাঁর অভিনয়ের সঙ্গে নিজেদের আবেগকে জড়িয়ে রেখেছেন। বিশেষ করে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ধারাবাহিকে দাদুর চরিত্রে তাঁর উপস্থিতি দর্শকদের কাছে হয়ে উঠেছিল অত্যন্ত আপন।

পার্থসারথী দেবের দীর্ঘ অভিনয় জীবনে রয়েছে একাধিক স্মরণীয় কাজ। তিনি অভিনয় করেছেন ‘ছোট বকুলপুরের যাত্রী’, ‘আত্মজ’, ‘সোনার কেল্লা’, ‘লাঠি’, ‘কাকাবাবু হেরে গেলেন’, ‘মহাপৃথিবী’, ‘শুধু তুমি’, ‘সাথী আমার’, ‘শক্তি’, ‘তারা’, ‘সেদিন দুজনে’, ‘রোমিও’, ‘প্রেম আমার’, ‘বগলা মামা’, ‘যুগযুগ জিও’, ‘কল্পতরু’ এবং ‘রক্তবীজ’-এর মতো জনপ্রিয় ছবিতে। পাশাপাশি ‘এক আকাশের নিচে’, ‘মিঠাই’, ‘চুনিপান্না’, ‘জয়ী’, ‘বোধিসত্ত্বের বোধবুদ্ধি’, ‘করুণাময়ী রানী রাসমণি’ এবং ‘অপরাজিতা অপু’-সহ বহু জনপ্রিয় বাংলা ধারাবাহিকেও তিনি অভিনয় করেছেন। অভিনয় তাঁর কাছে শুধুমাত্র পেশা ছিল না, ছিল এক আজীবনের সাধনা। প্রতিটি চরিত্রকে তিনি নিজের মতো করে গড়ে তুলেছিলেন, যার জন্য আজও দর্শকমনে তিনি অমলিন।

ব্যক্তিগত জীবনে অভিনেত্রী বিনীতা দেব ব্যানার্জীকে বিয়ে করেছিলেন পার্থসারথী দেব। তাঁদের একটি কন্যা সন্তানও রয়েছে। বহু বছর একসঙ্গে সংসার করার পর পারিবারিক মতবিরোধের কারণে ২০১৮ সালে আইনত বিচ্ছেদ ঘটে তাঁদের। বিচ্ছেদের পর মেয়ে মায়ের সঙ্গেই থাকতেন এবং পার্থসারথী দেব ধীরে ধীরে একাকী জীবনযাপন শুরু করেন। কর্মজীবনে অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা পেলেও ব্যক্তিগত জীবনের এই অধ্যায় তাঁর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। শেষ জীবনে তাঁর পরিবারের সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে উঠেছিলেন ভাইপো-ভাইঝিরা, যারা নিয়মিত তাঁর খোঁজখবর নিতেন এবং পাশে ছিলেন।

আরও পড়ুনঃ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এলো মৃ’ত্যুসংবাদ, বাড়ি ফিরে আর স্বামীকে জীবিত দেখতে পাননি লিলি চক্রবর্তী! চোখে দেখতে পেতেন না, হাঁটতেও পারতেন না, তবু স্ত্রীর সাফল্যের পথে বাধা হননি! শেষ দিনেও শুটিংয়ের অনুমতি দিয়েই না ফেরার দেশে পাড়ি! নিজের সবকিছু উজাড় করে স্ত্রীর স্বপ্নকে আগলে রেখেছিলেন, তাঁর বেদনাদায়ক মৃ’ত্যুর স্মৃতিচারণ করে কেঁদে ফেললেন বর্ষীয়ান অভিনেত্রী! তাঁর কোন কথা আজও তাড়া করে?

জীবনের শেষ অধ্যায় ছিল আরও বেশি কষ্টের। দীর্ঘদিন ধরে তিনি সিওপিডি বা শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন। প্রায় দেড় মাস হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন তিনি। চিকিৎসকদের তরফে জানা যায়, তাঁর নিউমোনিয়া এবং ফুসফুসে সংক্রমণ ধরা পড়েছিল। পাশাপাশি বার্ধক্যজনিত একাধিক শারীরিক সমস্যাও তাঁকে কাবু করে ফেলেছিল। হাসপাতালে ভর্তি থাকাকালীন তাঁর জ্ঞান থাকলেও তিনি কারও সঙ্গে কথা বলতে পারতেন না। তবে পরিচিত মানুষদের তিনি চিনতে পারতেন। সহকর্মী ও বন্ধুদের অনেকেই তাঁকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন। জীবনের শেষ সময়ে তিনি কার্যত নিঃসঙ্গতার সঙ্গেই লড়াই করেছেন। অবশেষে ২০২৪ সালের ২২ মার্চ, ৬৮ বছর বয়সে তিনি সকলকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি দেন। পর্দার আড়ালে থাকা এই শিল্পীর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয় করতালির শব্দ একদিন থেমে গেলেও একজন শিল্পীর অবদান কখনও হারিয়ে যায় না। পার্থসারথী দেব তাঁর অভিনয় এবং জীবনের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলা বিনোদন জগতের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

You cannot copy content of this page