বিনোদন জগতের ঝলমলে পর্দার আড়ালে থাকা সম্পর্ক, বন্ধুত্ব, অভিমান আর ভালোবাসার বহু গল্পই সাধারণ দর্শকের অজানা। বিশেষ করে বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগের তারকাদের ব্যক্তিগত জীবনের ছোট ছোট মুহূর্তগুলি আজও কৌতূহল তৈরি করে। মহানায়ক উত্তম কুমার এবং কিংবদন্তি অভিনেতা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পর্কও ছিল তেমনই আপন, যেখানে বন্ধুত্বের পাশাপাশি ছিল দাদা-ভাইয়ের মতো স্নেহ, পরামর্শ, অভিমান এবং কখনও সখনও মজার মুহূর্ত। উত্তম কুমারের শতবর্ষ উদযাপনের আবহে সেই অজানা স্মৃতিই সামনে এনেছেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের মেয়ে বাসবী ঘটক।
বাসবী বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, উত্তম কুমার তাঁর কাছে শুধুমাত্র বাংলা ছবির মহানায়ক ছিলেন না, ছিলেন ‘উত্তম কাকু’। ছোটবেলা থেকেই তাঁদের বাড়িতে তাঁর আসা-যাওয়া ছিল। একইভাবে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেও উত্তম কুমারের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। বয়সে ভানুর থেকে প্রায় ছ’বছর ছোট হলেও উত্তম কুমার তাঁকে ‘ভানুদা’ বলে ডাকতেন এবং তাঁর পরামর্শও অত্যন্ত মন দিয়ে শুনতেন। এমনকি ইন্ডাস্ট্রিতে ভানু-উত্তমের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হওয়ার সময়ও সেই সম্পর্কের গভীরতা প্রকাশ পেয়েছিল। কিছুদিন কথা বন্ধ থাকার পর উত্তম কুমার যখন ভানুকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘কেমন আছিস?’ তখন ভানু অভিমানে তাঁকে ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করেন। উত্তম কুমারের পাল্টা প্রশ্ন ছিল, ‘তুই আমাকে আপনি বলছিস কেন?’ যা তাঁদের অভিমানের মধ্যেও থাকা আপন সম্পর্কটাকেই স্পষ্ট করে।
বাসবী জানান, ছোটবেলায় উত্তম কাকুকে অত্যন্ত সহজ-সরল মানুষ হিসেবেই দেখেছেন তিনি। ‘চৌরঙ্গী’ ছবির শুটিংয়ের সময় গ্র্যান্ড হোটেলের একটি ঘরে উত্তম কুমার তাঁর সামনে একটি দৃশ্যের রিহার্সাল করছিলেন। কোনও কাজ খুব মন দিয়ে করলে উত্তম কুমারের চোখের একটি বিশেষ ভঙ্গি তৈরি হত, যেটিকে বাসবীর বাবা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় মজা করে ‘লক্ষ্মী ট্যারা’ বলতেন। সেই রিহার্সালের পর উত্তম কুমার বাসবীকে বলেন, অনেকক্ষণ হয়ে গিয়েছে, এবার চল ‘বেনু’, অর্থাৎ সুপ্রিয়া দেবী, খাবার পাঠিয়েছেন, দু’জনে একসঙ্গে খাওয়া যাক। মহানায়কের সঙ্গে এমন ব্যক্তিগত মুহূর্ত আজও তাঁর কাছে পরম পাওয়া।
উত্তম কুমারের সঙ্গে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পর্কের আরও একটি দিক উঠে আসে বাসবীর কথায়। উত্তম কুমারকে তিনি কখনও রাগী হিসেবে দেখেননি, বরং অত্যন্ত অভিমানী মানুষ হিসেবে দেখেছেন। একসময় দু’জনের মধ্যে কথা বন্ধ থাকলেও সেই অভিমান বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। আবার উত্তম কুমারের ভবানীপুরের বাড়ি ছেড়ে ময়রা স্ট্রিটে চলে যাওয়ার বিষয়টিও ভানুর ভালো লাগেনি। তবে নিজের স্পষ্টভাষী স্বভাব অনুযায়ী তিনি উত্তমের মুখের উপরই নিজের মতামত জানিয়েছিলেন। এমনকি বাসবীর বিয়ের নিমন্ত্রণপত্র দিতে গিয়ে উত্তম কুমার ও সুপ্রিয়া দেবীর জন্য আলাদা কার্ড দেওয়ার প্রসঙ্গেও ভানুর রসিক মন্তব্য ছিল তিনি গৌরী কাকিমাকে নিজে গিয়ে কার্ড দিয়ে এসেছেন, কারণ তাঁকে ‘মিসেস চ্যাটার্জি’ বলে ডাকতে পারবেন না!
আরও পড়ুনঃ “প্রতি বছরই এই মাসটা কিছু না কিছু নিয়ে আসে আবার কেড়ে নেয়…আমি আজও তোমারই, শুধু তুমি নেই মা” বাবা তাঁর নাম রেখেছিলেন ‘টুম্পা’, আর মা আদর করে ডাকতেন ‘সোনামণি! ১২ অগস্টেই মাকে চিরতরে হারিয়েছিলেন, লাগাতার বিত’র্কের মাঝেই আবেগঘন স্মৃতিচারণ শ্রীলেখা মিত্রের! জানালেন, কোন অপূর্ণ ইচ্ছা আজও তাঁকে ক’ষ্ট দেয়?
১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই উত্তম কুমারের মৃত্যুর খবরও ভানু পরিবারকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল। বাসবীর কথায়, নিজের লোক, নিজের কাকা চলে যাওয়ার মতোই সেই শোক নেমে এসেছিল তাঁদের পরিবারে। বাবার উপরও প্রবল ধাক্কা এসেছিল এবং পরবর্তী জীবনেও উত্তম কুমারকে তিনি অসম্ভব মিস করতেন। বাসবীর স্মৃতিতে তাই উত্তম কুমার শুধু পর্দার মহানায়ক নন তিনি পরিবারের অত্যন্ত কাছের একজন মানুষ। সেই কারণেই তাঁর বলা ‘লক্ষ্মী ট্যারা’, অভিমান, একসঙ্গে খাওয়ার নিমন্ত্রণ কিংবা ‘ভানুদা’র সঙ্গে বন্ধুত্বের মতো ছোট ছোট ঘটনাগুলিই আজ বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগের এক অমূল্য দলিল হয়ে উঠেছে।






