বিনোদন জগতের তারকাদের ছেলেমেয়েদের ঘিরে বরাবরই আলাদা কৌতূহল থাকে। জনপ্রিয় বাবা-মায়ের পরিচয়কে হাতিয়ার করে অনেকেই খুব সহজেই আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন। কিন্তু সবাই যে খ্যাতির পিছনে ছুটবেন, এমনটা নয়। বরং পরিচিতির আলো থেকে নিজেকে দূরে রেখে নিজের মতো করে জীবন কাটানোর পথ বেছে নিয়েছেন অনেকেই। তেমনই একজন অভিনেত্রী শকুন্তলা বড়ুয়ার মেয়ে পিলু বিদ্যার্থী। মায়ের বিপুল জনপ্রিয়তা ছোটবেলা থেকেই চোখের সামনে দেখেছেন, শুটিংয়ে মায়ের সঙ্গে গিয়েছেন, দেখেছেন অনুরাগীদের ভিড়, অটোগ্রাফ নেওয়ার উন্মাদনা। কিন্তু কোনওদিনই সেই জগতের প্রতি তৈরি হয়নি তাঁর মোহ। বরং নিজের মতো করে বাঁচা, শেখা, সম্পর্ককে নিজের জায়গায় রাখা এবং জীবনের প্রতিটি অধ্যায়কে নিজের মতো করে আবিষ্কার করাই হয়ে উঠেছে তাঁর জীবনের মূল দর্শন।
পিলু বিদ্যার্থীর আসল নাম রাজশী বড়ুয়া। অভিনয় ও বিনোদন জগতের সঙ্গে তাঁর পরিচয় অবশ্যই ছিল পারিবারিক সূত্রে, কিন্তু সেই পরিচয়কে নিজের ভবিষ্যতের গন্তব্য হিসেবে কখনও দেখেননি তিনি। কলকাতাতেই তাঁর বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা ও জীবনের বড় একটা সময় কেটেছে। নাচ, গান, কলেজের অনুষ্ঠান এসব নিয়েই নিজের মতো করে আনন্দে থেকেছেন তিনি। পরবর্তীতে কাজের সূত্রে মুম্বইয়ে গেলেও কলকাতার সঙ্গে তাঁর টান কখনও কমেনি। তাঁর কথায়, ছোটবেলা থেকেই ‘ফেম’ বা ‘নেম’-এর প্রতি কোনও আকর্ষণ অনুভব করেননি। মায়ের মেয়ে হিসেবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ থাকলেও নিজের পরিচয় নিজেকেই তৈরি করতে চেয়েছেন। এমনকি আজও ‘পিলু’ নামেই বেশি পরিচিত হলেও সরকারি নথিতে তাঁর নাম রাজশী। ‘পিলু’ নামটি তাঁর দিদিমার দেওয়া, আর ‘বিদ্যার্থী’ পরিচয়টিও তিনি নিজের মতো করে গ্রহণ করেছেন। তাঁর কাছে নামের চেয়ে মানুষটি গুরুত্বপূর্ণ।
খ্যাতির পিছনে না ছুটে নিজের ভিতরের মানুষটিকে চেনার পথেই যেন বেশি আগ্রহ পিলুর। সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, সারাক্ষণ কিছু একটা করতে হবে, দৌড়তে হবে এই মানসিকতার মধ্যে তিনি নিজেকে কখনও আটকে রাখতে চাননি। বরং কখনও কখনও স্তব্ধতার মধ্যেও ভালো থাকা যায়, সেটাই তিনি শিখেছেন। একা থাকার অভ্যাস তাঁকে নিজের সঙ্গে সময় কাটাতে এবং নিজের অনুভূতিগুলোকে বুঝতে সাহায্য করেছে। তাঁর মতে, বাইরে থেকে নিজের দিকে তাকালে অনেক কিছু বোঝা যায় না, নিজের ভিতরে যেতে হয়। সেই যাত্রা মেডিটেশন, গান বা অন্য কোনও পথেও হতে পারে। নিজের জীবনেও তিনি সেই পথ বেছে নিয়েছেন। সম্পর্ক নিয়েও তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা। বিচ্ছেদ, নাম পরিবর্তন বা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে সমাজের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার তাগিদ তিনি অনুভব করেননি। তাঁর কথায়, মানুষের জীবনের প্রতিটি সম্পর্কের আলাদা জায়গা রয়েছে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও বন্ধুত্বকে একে অপরের সঙ্গে মিশিয়ে না ফেলে নিজের নিজের জায়গায় রাখতে হয়।
আরও পড়ুনঃ ‘কোনও আ’ঘাতকে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব তখনই…’ ছোটবেলার একের পর এক মা’নসিক ধা’ক্কা সামলিয়ে, অভিনয়ে আসা, বারবার অডিশন দিয়েও ফিরতে হয়েছে খালি হাতে! হাল ছেড়ে দেওয়ার মুহূর্তে কোন উপলব্ধি থেকে নিজেকে বদলে ফেললেন স্নেহা গুড়িয়া? জানেন, নাচের মঞ্চ থেকে ‘বাবলি সুন্দরী’র নায়িকা হয়ে ওঠার নেপথ্যে আসলে কতটা লড়াই লুকিয়ে আছে?
আর সেই আত্মঅনুসন্ধানের পথেই গানকে নিজের অন্যতম আশ্রয় করে নিয়েছেন পিলু। তাঁর কাছে গান শুধু পারফরম্যান্স নয়, নিজের ভিতরের কথা প্রকাশের একটি মাধ্যম। সেই ভাবনা থেকেই মহিলাদের জন্য ‘গানময়’ ধরনের ওয়ার্কশপের মাধ্যমে গানকে আত্মপ্রকাশের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন তিনি। সেখানে নিখুঁতভাবে গান শেখানোর চেয়ে নিজের ভয়, সংকোচ ও আবেগকে প্রকাশ করার সুযোগ তৈরি করাই তাঁর উদ্দেশ্য। তাঁর বিশ্বাস, প্রত্যেক মানুষের ভিতরে কিছু না কিছু বলার মতো গল্প রয়েছে, কিন্তু অনেকেই তা প্রকাশ করতে পারেন না। গান সেই বন্ধ দরজাটা খুলে দিতে পারে। নিজের জীবন নিয়েও একই দর্শন তাঁর ‘পারফেক্ট’ হয়ে যাওয়ার দাবি নয়, বরং প্রতিদিন কিছু শেখা, ভুল করা, নিজেকে শুধরে নেওয়া। তাই পিলু বিদ্যার্থী আজও নিজেকে একজন ‘শিক্ষার্থী’ হিসেবেই দেখতে চান। তাঁর কাছে জীবন কোনও নির্দিষ্ট উত্তর নয়, বরং প্রতিদিন নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করার এক চলমান যাত্রা।






