“ওই মানুষটা স্রেফ দু-মুঠো ভাতের জন্য টেবিলে টেবিলে ঘোরে, তাঁকে এমন অপমান অশিক্ষার প্রমাণ!” “পনেরো সেকেন্ডের জনপ্রিয়তার জন্য, জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা সাজে?” সায়কের ‘অলিপাব’ বিতর্কে, ওয়েটারের মানসিক স্বাস্থ্য-নিরাপত্তা নিয়ে সরব রাহুল দেব বোস!

সামাজিক মাধ্যমে গতকাল থেকে যে ঘটনাটি সবচেয়ে বেশি আলোচনায়, তার কেন্দ্রে রয়েছেন ভ্লগার ‘সায়ক চক্রবর্তী’ (Sayak Chakraborty)। পার্ক স্ট্রিটের পরিচিত রেস্তোরাঁ ‘অলিপাবে’ (Olypub) খাওয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে করা তাঁর একটি ভিডিও থেকেই বিতর্কের সূত্রপাত। ভিডিওতে তিনি অভিযোগ করেন, পাঁঠার বদলে তাঁকে ‘গোমাং’স’ খাওয়ানো হয়েছে। বিষয়টি বুঝতে পেরে তিনি রেস্তোরাঁর ম্যানেজারকে ডেকে পাঠান এবং পর্বটিতে তাঁর সঙ্গে তর্কে জড়ান, নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসের কথা তুলে ধরে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

এই দৃশ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়তেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে যে ঘটনাটি আদৌ কতটা অনিচ্ছাকৃত, আর কতটা ক্যামেরার জন্য তৈরি? এই ভিডিও সামনে আসার পর সামাজিক মাধ্যম কার্যত দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। একদল মনে করেন, নামী রেস্তোরাঁয় এমন ভুল হওয়া অসম্ভবের কাছাকাছি, বিশেষ করে যে জায়গাটি বহু বছর ধরে নির্দিষ্ট কিছু খাবারের জন্য পরিচিত। আবার অনেকে প্রশ্ন তোলেন, যে ব্যক্তি জীবনে কখনও একটি বিশেষ ধরনের মাংস খাননি, তিনি সেটা খেয়ে ফেলেও বুঝতে পারলেন না, এটা কতটা বিশ্বাসযোগ্য?

এই সন্দেহের জায়গা থেকেই অনেকে পুরো ঘটনাকে ‘পরিকল্পিত কনটেন্ট’ বলেও আখ্যা দেন। অন্যদিকে, কেউ কেউ আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এই ধরনের ভিডিও ধর্মীয় সংবেদনশীলতাকে ইচ্ছাকৃতভাবে ধোঁয়া দিচ্ছে যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে। এই পরিপ্রেক্ষিতে নেট নাগরিকদের পাশাপাশি শিল্পীরাও মুখ খুলতে শুরু করেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন ‘রাহুল দেব বোস’ (Rahul Dev Bose)। তিনি লেখেন, ব্যক্তিগতভাবে সায়ককে ভদ্র ও মার্জিত মানুষ হিসেবেই চেনেন, তবে এই ঘটনায় তাঁর আচরণ তাঁকে হতাশ করেছে!

বিশেষ করে তিনি মনে করিয়ে দেন, অলিপাব নতুন কোনও রেস্তোরাঁ নয়। দশকের পর দশক ধরে পার্ক স্ট্রিটে থাকা এই জায়গাটি মূলত বিফ স্টেকের জন্যই পরিচিত। এমন একটি রেস্তোরাঁয় গিয়ে, যদি কেউ নিজের ধর্মীয় পরিচয়ের কথা তুলে ধরেন, তবে সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। কারণ বিষয়টি শুধুমাত্র একটি খাবার না খাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, রান্নার পাত্র ও পরিবেশের সঙ্গেও জড়িয়ে যায়। রাহুল তাঁর লেখায় ঘটনার মানবিক দিকটিকেও সামনে আনেন।

তিনি বলেন, এই ধরনের রেস্তোরাঁয় কাজ করা ওয়েটাররা প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করেন, সামান্য মজুরির বিনিময়ে টেবিল থেকে টেবিলে ছুটে বেড়ান। শহরের নামী জায়গায় ভুল খাবার পরিবেশন হওয়া নতুন কিছু নয়। অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগ জানিয়ে খাবার বদলে নেওয়া হয়, কখনও ছাড় পাওয়া যায়, আর সেখানেই বিষয়টি শেষ হয়। মানুষ মাত্রেই ভুল করে, আর সেই ভুল সংশোধনের সুযোগ দিলে দু’পক্ষই সম্মান বাঁচিয়ে এগোতে পারে। অথচ ভিডিওতে যে ওয়েটারকে বারবার ক্ষমা চাইতে দেখা যায়, সেই দৃশ্য অনেকের কাছেই বেদনাদায়ক ঠেকেছে।

আরও পড়ুনঃ “আমি স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শে বিশ্বাসী… সৃষ্টিকর্তা আমাদের রক্তে ফারাক করেননি, আমরা সবাই মানুষ!” সায়ক চক্রবর্তীর ‘গ’রুর মাং’স’ বিতর্কের প্রেক্ষাপটে, মানবতা ও সহমর্মিতা নিয়ে সরব অভিনেতা রাজা গোস্বামী!

সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্নটি উঠে আসে নিরাপত্তা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে। এমন এক দেশে, যেখানে গুজব বা অভিযোগ থেকে ভয়াবহ পরিণতি ঘটার নজির রয়েছে, সেখানে একজন সাধারণ কর্মীকে প্রকাশ্যে চিহ্নিত করে দেওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত, এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না। কয়েক সেকেন্ডের ভাইরাল জনপ্রিয়তার জন্য কি কারও জীবন ও মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়ানো উচিত? রাহুলের কথায়, বিশেষ সুবিধাভোগী মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের কথা আমরা যত সহজে বলি, ততটাই গুরুত্ব দেওয়া দরকার সেই মানুষটির দিকেও, যিনি দিনের শেষে ন্যূনতম চিকিৎসার সামর্থ্যও রাখেন না!

You cannot copy content of this page