“রাত ৩ টে থেকে পায়ের কাছে চুপ করে বসে ছিলেন, তারপর যা করলেন…” উত্তম কুমারের মৃ’ত্যুর দিনে মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের সেই অদ্ভুত কাণ্ড, আজও মনে পড়লে গায়ে কাঁটা দেয় রত্না ঘোষালের! কী অবস্থা ছিল সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের? দুই কিংবদন্তি জুটির ইতি ঘটেছিল সেদিন, মহানায়কের প্রয়াণে দুই প্রিয় নায়িকার প্রতিক্রিয়ার স্মৃতি ভাগ করে নিলেন অভিনেত্রী?

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে উত্তম কুমার অর্থাৎ ‘মহানায়ক’ নামটি যেন চিরকাল এক এবং অদ্বিতীয়। তাঁর অভিনয়, ব্যক্তিত্ব এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা তাঁকে আজও বাঙালির হৃদয়ে অমর করে রেখেছে। প্রতি বছর ২৪ জুলাই পালিত হয় তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৮০ সালের এই দিনেই মাত্র ৫৩ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন তিনি। মৃত্যুর ৪৬ বছর পরেও তাঁর জনপ্রিয়তা একটুও ম্লান হয়নি। তাঁর সহ-অভিনেতা-অভিনেত্রীদের স্মৃতিচারণায় আজও ফিরে আসে এক অন্য উত্তম কুমারের ছবি যিনি শুধুমাত্র মহানায়কই নন, ছিলেন অত্যন্ত বড় মনের একজন মানুষ।

উত্তম কুমারের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে সম্প্রতি তাঁর স্মৃতিচারণায় মুখ খুলেছেন বর্ষীয়ান অভিনেত্রী রত্না ঘোষাল। তিনি জানান, ছোটবেলা থেকেই উত্তম কুমারের সঙ্গে তাঁর অত্যন্ত স্নেহের সম্পর্ক ছিল। রত্নার ডাকনাম ‘মাটু’ আর উত্তম কুমার তাঁকে সেই নামেই ডাকতেন। অভিনেত্রীর কথায়, “আজও মনে হয়, যদি একবার ফিরে এসে আমাকে ডাকতেন ‘মাটু, কেমন আছিস?’” মাত্র আট বছর বয়সে উত্তম কুমারের সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয় হয়। তিনি কখনও অনুভব করেননি যে তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় তারকার সঙ্গে কাজ করছেন। বরং তাঁর কাছে উত্তম কুমার ছিলেন পরিবারের একজন বড় দাদার মতো। প্রয়োজনে তাঁকে ফোন করে খাওয়ার আবদারও করেছেন তিনি, আর মহানায়ক সানন্দে সেই আবদার পূরণ করেছেন। রত্না ঘোষালের কথায়, “উনি কখনও আমাদের বুঝতে দেননি যে তিনি উত্তম কুমার। আমাদের কাছে তিনি শুধু দাদাই ছিলেন।”

উত্তম কুমারের ব্যক্তিত্ব এবং অভিনয় সম্পর্কে বলতে গিয়ে রত্না ঘোষাল স্পষ্ট ভাষায় জানান, আজকের অনেক শিল্পীর মধ্যেই তিনি সেই নিষ্ঠা দেখতে পান না। তাঁর মতে, চরিত্রকে কীভাবে নিজের মধ্যে ধারণ করে অভিনয় করতে হয়, তা উত্তম কুমারই শিখিয়ে গিয়েছেন। তিনি বলতেন, একটি দৃশ্যে যতজন শিল্পী থাকেন, তাঁরা সবাই মিলে যেন একটি ফুলের সাজি। সেই সাজির একটি ফুলও যদি সুন্দর না হয়, তাহলে পুরো সাজিটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাই তিনি সবসময় চাইতেন, একটি দৃশ্যে উপস্থিত প্রত্যেক শিল্পীই যেন নিজের অভিনয়ের মাধ্যমে সমানভাবে দর্শকের মনে জায়গা করে নিতে পারেন। শুধু অভিনয় নয়, একজন বড় শিল্পী হতে গেলে আগে বড় মনের মানুষ হতে হবে এই শিক্ষাও তিনি সকলকে দিতেন। রত্না ঘোষালের দাবি, উত্তম কুমার নিঃশব্দে বহু মানুষকে সাহায্য করেছেন, কিন্তু কখনও তা প্রচারের আলোয় আনেননি।

আরও পড়ুন: “পুলিশ কিছু করার আগে আপনি দু-চার ঘা হাত চালিয়ে নিজের রাগ মেটান, ব্যপক পি’টিয়ে মাথা ফাটিয়ে দিন!” “এই প্রবণতার বিরুদ্ধে সরব হয়ে প্রশাসনের উপর চাপ তৈরি করলে আজ…” সমাজকে যা শেখাবেন সেটাই ঘুরে আপনার কাছে আসবে, ফের সরব অরিত্র দত্ত বনিক! এবার বিদেশি অর্থ, ‘ডিপ স্টেট’ তত্ত্ব থেকে সাংবাদিকদের উপর হামলা নিয়ে তুললেন একগুচ্ছ প্রশ্ন?

সুচিত্রা সেনের সঙ্গে উত্তম কুমারের সম্পর্ক নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেছেন রত্না ঘোষাল। তিনি জানান, উত্তম কুমারের মৃত্যুর দিন একটি ঘটনা তিনি কখনও ভুলতে পারবেন না। সাধারণত সুচিত্রা সেন জনসমক্ষে খুব কমই আসতেন। কিন্তু উত্তম কুমারের মৃত্যুর খবর পেয়ে তিনি গভীর রাতে, প্রায় রাত তিনটের সময় সেখানে উপস্থিত হন। মাথায় কাপড় দিয়ে নিঃশব্দে মহানায়কের পায়ের কাছে বসে থাকেন প্রায় এক ঘণ্টা। ভোর চারটে যখন ধীরে ধীরে মানুষের ভিড় বাড়তে শুরু করে, তখন কাউকে কিছু না বলে তিনি সেখান থেকে চলে যান। রত্না ঘোষালের মতে, এই ঘটনাই প্রমাণ করে তাঁদের বন্ধুত্ব এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার গভীরতা কতটা ছিল। তাঁর কথায়, “ভালো বন্ধু না হলে ভালো অভিনয়ও করা যায় না।”

অন্যদিকে, অভিনেত্রী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গেও উত্তম কুমারের অসাধারণ বন্ধুত্বপূর্ণ এবং পেশাদার সম্পর্ক ছিল বলে জানিয়েছেন রত্না ঘোষাল। তিনি বলেন, উত্তম কুমার নিজেই একাধিকবার বলতেন যে, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় এমন একজন অভিনেত্রী, যার সঙ্গে অভিনয় করতে তাঁর ভয় লাগত। কারণ, সাবিত্রী এতটাই দক্ষ অভিনেত্রী ছিলেন যে, তাঁর অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে উত্তম কুমার নিজেও অনেক সময় চরিত্রের মধ্যে হারিয়ে যেতেন। তিনি আদর করে সাবিত্রীকে ‘সাবু’ বলে ডাকতেন। রত্না ঘোষালের এই স্মৃতিচারণ শুধু একজন মহান অভিনেতার অভিনয় দক্ষতার কথাই নয়, তাঁর মানবিকতা, সহকর্মীদের প্রতি সম্মান এবং সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়ার মানসিকতার কথাও নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। তাই মৃত্যুর এত বছর পরেও উত্তম কুমার শুধু বাংলা সিনেমার মহানায়ক নন, তিনি আজও বাঙালির আবেগ, ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধার এক চিরন্তন নাম।

You cannot copy content of this page