“বাবা মা’রা যাওয়া পর্যন্ত আমার চাকরি করাটা মেনে নেননি…আমি কি করব খুব নিশ্চিত ছিলাম, কিন্তু কারও সঙ্গে ঝগড়া করিনি” শ্বশুরবাড়িতে বউদের চাকরি করার স্বাধীনতা ছিল না, যৌথ পরিবারের কড়া আপত্তির মধ্যেও কীভাবে নীরব লড়াইয়ে নিজের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন শাশ্বতী গুহ ঠাকুরতা?

বিনোদন জগতের ঝলমলে আলো, ক্যামেরার সামনে হাসিমুখ আর দর্শকদের অফুরন্ত ভালোবাসার আড়ালে লুকিয়ে থাকে বহু না বলা গল্প। জনপ্রিয়তার হাতছানি, অর্থের মোহ, ক্ষমতার প্রভাব কিংবা ব্যক্তিগত সংগ্রাম এই সমস্ত কিছু মিলিয়েই তৈরি হয় একজন শিল্পীর বাস্তব জীবন। বাইরে থেকে যেটা অনেক সময় স্বপ্নের মতো মনে হয়, তার ভিতরে থাকে কঠিন লড়াই, মানসিক চাপ এবং নিজেকে টিকিয়ে রাখার যুদ্ধ। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া, পিআর এবং রাজনৈতিক প্রভাবের দুনিয়ায় শিল্পীদের অবস্থান ও মূল্যবোধ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। এই সমস্ত বিষয় নিয়েই এবার অকপটে মুখ খুললেন অভিনেত্রী শাশ্বতী গুহ ঠাকুরতা (Saswati Guha thakurta)।

দূরদর্শনের অত্যন্ত পরিচিত মুখ হিসেবে যাঁকে একসময় বাংলার প্রায় প্রতিটি বাড়ির মানুষ চিনতেন, সেই শাশ্বতী গুহ ঠাকুরতা আজও একইরকম সাবলীল, স্পষ্টভাষী এবং মাটির মানুষ। ১৯৭৫ সালে দূরদর্শনে কাজ শুরু করে ২০১২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি শুধু সংবাদ পাঠিকা হিসেবেই নন, অভিনয়শিল্পী, শিক্ষক এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। টেলিভিশন, মঞ্চ এবং সিনেমা প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি নিজের ছাপ রেখে গিয়েছেন। কিন্তু এত বছরের পরিচিতি ও জনপ্রিয়তার পরেও নিজেকে কখনও ‘তারকা’ বলে ভাবতে পারেননি অভিনেত্রী। তাঁর কথায়, “আমাদের ফিল্মস্টারের মতো দূরের মানুষ ভাবা হতো না। আমরা ছিলাম ঘরের মেয়ে। মানুষ আমাদের নিজের পরিবারের একজন বলেই মনে করতেন।”

সেই সহজ, স্বাভাবিক পরিচিতিই আজও তাঁকে দর্শকদের কাছে আলাদা করে রেখেছে। বর্তমান সমাজ, বিনোদন জগৎ এবং নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের নিয়েও স্পষ্ট মত প্রকাশ করেছেন শাশ্বতী গুহ ঠাকুরতা। তাঁর মতে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিল্প জগতের পরিবেশ অনেকটাই বদলে গেছে। আগে যেখানে কাজের মূল্য ছিল প্রতিভা ও অভিজ্ঞতায়, এখন সেখানে সোশ্যাল মিডিয়ার ফলোয়ার সংখ্যা, পিআর এবং রাজনৈতিক যোগাযোগ অনেক ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। অভিনেত্রী বলেন, “এখন শুনি ইনস্টাগ্রামে এ কত ফলোয়ার আছে তার উপরেও কাজ দেওয়া হয়। এটা পুরোপুরি মিথ্যে নয়।” একইসঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, জনপ্রিয়তা এবং অর্থের আকর্ষণ অনেক সময় খুব অল্প বয়সেই মানুষকে বিভ্রান্ত করে দেয়।

তাঁর কথায়, “মানুষ তোমাকে নিয়ে হইহই করছে, প্রচুর টাকা আসছে, চারদিকে হাতছানি, এই জায়গায় মাথা ঘুরে যাওয়াটা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু তখন বুঝতে হবে কোন জায়গায় তুমি হ্যাঁ বলবে আর কোন জায়গায় না।” রাজনীতি এবং বর্তমান সমাজ নিয়েও তাঁর পর্যবেক্ষণ ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেন, “আগে বড়লোক বলা হতো শিক্ষিত ও সমাজের জন্য কাজ করা মানুষদের। এখন বড়লোক মানেই যার কাছে অর্থ আছে।” একইভাবে ‘পাবলিক রিলেশন’ শব্দের অর্থও বদলে গেছে বলেই মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, এখন পিআর অনেকটাই কাজ পাওয়ার কৌশলে পরিণত হয়েছে।

তবে এই স্পষ্টভাষী অবস্থানের পিছনে রয়েছে তাঁর নিজের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। খুব অল্প বয়সে বিয়ে, যৌথ পরিবারের দায়িত্ব এবং সেইসঙ্গে নিজের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে হয়েছে তাঁকে। শাশ্বতী গুহ ঠাকুরতা জানান, তাঁর শ্বশুরবাড়ি ছিল ব্যবসায়ী পরিবার। সেখানে মহিলাদের বাইরে বেরিয়ে কাজ করার প্রচলন ছিল না। ফলে দূরদর্শনে কাজ করার সিদ্ধান্ত প্রথমদিকে মেনে নিতে পারেননি তাঁর শ্বশুরমশাই। অভিনেত্রীর কথায়, “আমি ১৯৭৫ সালে চাকরি পাই, কিন্তু বাবা ১৯৮৯ সালে মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত মন থেকে আমার চাকরি করাটা মেনে নিতে পারেননি।”

এই পরিস্থিতিতে অনেকেই হয়তো নিজের স্বপ্ন ছেড়ে দিতেন, কিন্তু তিনি থেমে যাননি। তবে সেই লড়াইয়ে কোনওদিন উচ্চস্বরে ঝগড়া বা জোরজবরদস্তির পথ বেছে নেননি। বরং ধৈর্য, আত্মবিশ্বাস এবং নীরব জেদের মাধ্যমেই নিজের জায়গা তৈরি করেছেন। তিনি বলেন, “আমি করবো এটা আমি খুব নিশ্চিত ছিলাম, কিন্তু তার জন্য কাউকে সঙ্গে নিয়ে ঝগড়া করতে হয়নি।” এই কঠিন সময়ে তাঁর শাশুড়ির নীরব সমর্থনের কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করেন অভিনেত্রী। পাশাপাশি যৌথ পরিবারে সন্তান মানুষ করার অভিজ্ঞতা নিয়েও কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, তাঁদের সময়ে শুধুমাত্র মা-বাবা নয়, গোটা পরিবার মিলে সন্তানদের বড় করে তুলত।

আরও পড়ুন: “ও আ’ত্মহ*ত্যা করতে পারে না…আমার মেয়েকে খুব ভালোবাসত, কোনও নে’শা করত না!” প্রাণবন্ত বান্ধবী তথা জনপ্রিয় মডেল-অভিনেত্রীর হঠাৎ মৃ’ত্যু, কিছুতেই মানতে পারছেন না স্বরলিপি চট্টোপাধ্যায়! একসঙ্গে থাকাকালীন কোন ব্যক্তিগত স্মৃতি সামনে আনলেন তিনি?

সেই পারিবারিক মূল্যবোধই তাঁকে আজও মাটির কাছাকাছি থাকতে শিখিয়েছে। আজ মধ্যসত্তর বয়সেও নতুন কিছু শেখার আগ্রহ হারাননি শাশ্বতী গুহ ঠাকুরতা। এআই থেকে শুরু করে নতুন প্রযুক্তি সবকিছু নিয়েই জানার কৌতূহল রয়েছে তাঁর। ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকেও শেখার কথা অকপটে স্বীকার করেন তিনি। তাঁর মতে, “শেখার কোনও শেষ নেই। যতদিন শেখার ইচ্ছে থাকবে, ততদিন মানুষ মাটি থেকে বিচ্ছিন্ন হবে না।” আর সেই কারণেই হয়তো এত সাফল্য, জনপ্রিয়তা এবং দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পরেও আজও তিনি থেকে গিয়েছেন একেবারে সাধারণ, সহজ এবং বাস্তবের মানুষ হিসেবে।

You cannot copy content of this page