“না চাইতেই অনেক কিছু জেনেছিলাম…গরু পাচার কাণ্ডে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চিঠি লিখেছিলেন বাবা” তৃণমূল হারতেই গুরুতর অভিযোগ তাপস কন্যার! ‘জানানো সত্ত্বেও কেন নেওয়া হয়নি কোনও অ্যাকশন?’ কোন ভয়ঙ্কর ঘটনা সামনে আনলেন সোহিনী পাল?

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বড় পালাবদল। প্রায় ১৫ বছরের দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতা হারিয়েছে। এই ফলাফলের পর থেকেই রাজ্য রাজনীতিতে শুরু হয়েছে তীব্র চাপানউতোর, দায়িত্ব নেওয়া, পদত্যাগ এবং গণরায়ের মর্যাদা নিয়ে বিতর্ক। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদত্যাগ না করার সিদ্ধান্তকে ঘিরে উঠছে প্রশ্নের ঝড়। বিরোধীরা একে “গণরায়ের অবমাননা” বলছে, অন্যদিকে সাংবিধানিক ব্যাখ্যায় উঠে আসছে যে নতুন সরকার শপথ না নেওয়া পর্যন্ত বিদায়ী সরকার কেয়ারটেকার হিসেবেই থাকতে পারে। এই উত্তাল পরিস্থিতির মধ্যেই সামনে এসেছে এক বিস্ফোরক পারিবারিক অভিজ্ঞতার বয়ান প্রয়াত অভিনেতা ও প্রাক্তন তৃণমূল সাংসদ তাপস পালের পরিবার থেকে।

তাপস পাল, বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় অভিনেতা এবং পরে তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ হিসেবে পরিচিত তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শেষদিকে নানা বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন, বিশেষত রোজ ভ্যালি চিটফান্ড মামলায়। ২০২০ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি হৃদরোগে তাঁর মৃত্যু হয়। তবে তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে রাজনৈতিক চাপ, তদন্তের মানসিক প্রভাব নিয়ে বিতর্ক থামেনি। এবার তৃণমূলের পরাজয়ের পর তাঁর মেয়ে সোহিনী পাল এবং স্ত্রী প্রকাশ্যে এনে দিলেন তাঁদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, যা নতুন করে রাজনৈতিক মহলে আলোড়ন ফেলেছে।

সোহিনী পালের কথায় উঠে এসেছে গভীর ক্ষোভ ও বেদনার সুর। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আমাদের অভিজ্ঞতাটা খুব ব্যক্তিগত আর গভীর। কারণ পার্সোনালি আমি আমার বাবাকে সাফার করতে দেখেছি খুব বাজেভাবে।” তাঁর দাবি, এই কষ্টের বড় অংশটাই এসেছে রাজনৈতিক জীবনের সময় থেকেই। তাঁর কথায়, “দলে থাকার সময়ই সবকিছু হয়েছে।” অর্থাৎ তৃণমূলের ভেতরেই তাঁর বাবার সমস্যার সূত্রপাত বলে ইঙ্গিত করেছেন তিনি।

আরও বিস্ফোরক দাবি করে সোহিনী জানান, তিনি নিজেই বাবার হয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিঠি লিখতেন। সেই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “২০১৫ বা ২০১৬-তে বাবার হয়ে আমি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে গরু পাচার নিয়ে চিঠি লিখেছিলাম। বাবা বলেছিলেন, ‘তুমি একটা চিঠি লেখো, আমি জানাতে চাই।’” এই বক্তব্যে তিনি ইঙ্গিত দেন যে তাপস পাল বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে জানাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তার কোনও ফল হয়নি। তাঁর কথায়, “ওটা জানানোর পরেও কোনও অ্যাকশন নেওয়া হয়নি। আমার বোকা বাবা ভেবেছিলেন বললে সব ঠিক হবে।”

সোহিনীর বক্তব্যে উঠে এসেছে তাপস পালের রাজনৈতিক জীবনে আচমকা পরিবর্তনের কথাও। তিনি বলেন, “উনার একটা ডিগ্রি ঘুরে যাওয়া দেখেছি হঠাৎ করে অচেনা হয়ে যাওয়া, ছোট করা, খারাপ ফিল করানো।” এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে তিনি তাঁর বাবার প্রতি দলের আচরণে এক ধরনের অবহেলা বা দূরত্ব অনুভব করেছিলেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন, “যারা ওনার খারাপ সময়ে পাশে দাঁড়িয়েছিল, উনি ভালো সময়ে তাদের ভুলে যেতেন, এটা শুধু বাবার ক্ষেত্রে নয়।”

এই মন্তব্যগুলির মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে রাজনৈতিক ফলাফলের সঙ্গে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার এক অদ্ভুত মেলবন্ধন। সোহিনী সরাসরি বলেন, “আমি আর পলিটিক্যালি কারেক্ট থাকতে চাই না। এটা খুব দরকার ছিল।” তাঁর আরও কড়া মন্তব্য, “অনেকে বলে দল আর ডায়াপার। দুটোই সময়ে সময়ে বদলানো উচিত, কারণ দুটোই দ্রুত নোংরা হয়।” এই বক্তব্য ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় তুমুল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

অন্যদিকে, রাজ্যের বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদত্যাগ না করা নিয়েও তীব্র সমালোচনা চলছে। বিরোধীদের বক্তব্য, “পরাজয়ের পর পদত্যাগ করাই রীতি, সেটাই শালীনতা।” তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সংবিধানের ১৬৪ ও ১৭২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নতুন সরকার শপথ নেওয়া পর্যন্ত বিদায়ী সরকার কেয়ারটেকার হিসেবে থাকতে পারে। ফলে এই বিতর্ক শুধুই রাজনৈতিক নয়, সাংবিধানিক ব্যাখ্যাতেও বিভক্ত।

আরও পড়ুনঃ “রাহুলের মৃ’ত্যুতদন্ত এবার এগোবে, সব অন্যায়ের বিচার হবে” “আমাকেও ব্যান করা হয়েছিল, প্রতিশোধ নেব…” বিজেপির ঐতিহাসিক জয়ের পর মুখ খুললেন রুদ্রনীল ঘোষ! টলিউডে ‘ব্যান সংস্কৃতি’ থেকে রাহুল অরুণোদয়ের রহস্যমৃ’ত্যু নিয়ে বড় রহস্য করলেন ফাঁস?

সব মিলিয়ে, তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয়ের পর রাজ্যে যে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায় শুরু হয়েছে, তার সঙ্গে জুড়ে গেছে অতীতের অপ্রকাশিত ক্ষোভ, অভিযোগ এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বিস্ফোরণ। তাপস পালের পরিবারের এই বক্তব্য সেই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে। এখন দেখার, এই অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের আবহে রাজ্যের নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ কোন দিকে মোড় নেয়।

You cannot copy content of this page