‘এখনও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বড় অভাব…লবি বা তদবির নয়, যোগ্য মানুষকে…’ তুখোড় অভিনয়, তবুও সেভাবে কেন সুযোগ পান না সঞ্জীব সরকার? নতুন সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে, বাংলা বিনোদন জগতের কোন অস্ব’স্তিকর বাস্তবতার পর্দা ফাঁস করলেন অভিনেতা?

বাংলা থিয়েটার ও অভিনয় জগতের পরিচিত মুখ সঞ্জীব সরকার বর্তমানে অভিনয় করছেন ‘নন্দিনী তোর জন্য’ ছবিতে। দীর্ঘদিনের মঞ্চাভিনেতা হিসেবে তিনি যেমন অভিনয়ের জগতে নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছেন, তেমনই সমাজ, সংস্কৃতি এবং শিল্পচর্চা নিয়ে তাঁর ভাবনাও বরাবরই স্পষ্ট। সম্প্রতি ছবির শুটিং চলাকালীন এক সাক্ষাৎকারে তিনি শুধু নতুন ছবির গল্প নিয়েই নয়, মানুষের সামাজিক দায়িত্ব, বাংলা থিয়েটারের বর্তমান অবস্থা, নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের সংগ্রাম এবং সরকারের ভূমিকা নিয়ে খোলামেলা মতামত প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্যে যেমন ছিল বাস্তবতার কঠিন ছবি, তেমনই ছিল ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদের বার্তা।

সাক্ষাৎকারের শুরুতেই ‘নন্দিনী তোর জন্য’ ছবির গল্প প্রসঙ্গে কথা বলেন সঞ্জীব সরকার। ছবির কাহিনিতে একটি ছোট মেয়ের জীবনে ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক ঘটনার উল্লেখ রয়েছে, যা সমাজের এক অন্ধকার বাস্তবতাকে তুলে ধরে। এই ধরনের ঘটনা সংবাদপত্রে বা সংবাদমাধ্যমে দেখলে তাঁর কেমন লাগে, সেই প্রশ্নের উত্তরে অভিনেতা বলেন, মানুষ নিজেকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রাণী বলে দাবি করলেও বাস্তবে অনেক ঘটনাই সেই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। তাঁর মতে, সমাজে ঘটে চলা নৃশংস ঘটনাগুলি মানুষকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে যে সত্যিই কি মানুষ শ্রেষ্ঠ, নাকি কখনও কখনও নিজের কাজের মাধ্যমে সে নিজেকেই নিকৃষ্ট প্রমাণ করে।

সিনেমার ভূমিকা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সঞ্জীব সরকার বলেন, সিনেমা আসলে বাস্তব জীবনের ভালো-মন্দকে শৈল্পিকভাবে দর্শকের সামনে তুলে ধরার একটি মাধ্যম। দর্শক শুধু বিনোদনই পান না, পাশাপাশি কিছু শিক্ষা ও উপলব্ধিও অর্জন করেন। তিনি মনে করেন, বর্তমানে প্রচুর ছবি তৈরি হলেও সব ছবি সমানভাবে সফল হয় না। তবে ‘নন্দিনী তোর জন্য’-এর গল্পের মধ্যে একটি শক্তিশালী বক্তব্য রয়েছে। তাঁর কথায়, এই গল্পে যেমন সত্য লুকিয়ে আছে, তেমনই রয়েছে সত্যের কুৎসিত দিকও। সেই বাস্তবতাকে সুন্দর ও অর্থবহভাবে দর্শকের সামনে তুলে ধরতে পারলে ছবিটি মানুষের মনে প্রভাব ফেলবে। পাশাপাশি সহ-অভিনেতাদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়েও তিনি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। দেবেশ চট্টোপাধ্যায়, অপরাজিতা ও অন্যান্য শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তাঁর একেবারেই নতুন পরিবেশ বলে মনে হয়নি। বরং পুরো ইউনিটটিকে একটি পরিবারের মতো মনে হয়েছে বলে জানান তিনি।

থিয়েটার প্রসঙ্গে সঞ্জীব সরকারের বক্তব্য ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। তিনি বলেন, বাংলা থিয়েটারে এখনও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বড় অভাব রয়েছে। থিয়েটারকে পেশাদার ক্ষেত্র বলা হলেও অধিকাংশ শিল্পী আর্থিকভাবে সেই সুবিধা পান না। তবে অর্থই যে সবকিছু নয়, সেটাও তিনি মনে করিয়ে দেন। তাঁর মতে, বর্তমানে বাংলায় এমন অনেক নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে যা দর্শকদের চমকে দিচ্ছে এবং নাট্যচর্চার মানকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের পরিশ্রম ও লড়াইয়ের মনোভাব তাঁকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করে। মালদা থেকে কলকাতায় এসে নিজের অভিনয়জীবন গড়ে তোলার অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, আজকের তরুণ শিল্পীরাও একইভাবে স্বপ্ন নিয়ে সংগ্রাম করছেন। তাই তাঁদের জন্য আরও ভালো সুযোগ ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি।

আরও পড়ুনঃ “মৃ’ত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছেন নিজেকেই…আমরা ‘গুলামি কা অমৃত মহোৎসবের’ উন্নয়নমুখী পর্যটক!” “যে দেশে মানুষকে মৃ’ত্যুমুখী হতে হয়, সেই সরকার দেশদ্রো’হী!” দেশনায়কের ‘মেলোডি’র ঠোঙা ফাঁকা! সোনম ওয়াংচুকের অনশনের পাশে দাঁড়িয়ে বি’স্ফোরক ঋদ্ধি সেন, সমর্থনে পোস্ট অপর্ণা সেনেরও? ঠিক কী বললেন দু’জনে?

নতুন সরকার এবং বাংলা বিনোদন জগতের ভবিষ্যৎ নিয়েও আশাবাদী সঞ্জীব সরকার। তাঁর দাবি, শিল্পীদের কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র যোগ্যতাকেই গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কোনও লবি বা প্রভাব নয়, বরং যে শিল্পী পরিশ্রম করছেন এবং যোগ্য, তাঁর প্রাপ্য কাজ ও সম্মান নিশ্চিত হওয়া দরকার। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে নতুন প্রশাসন থিয়েটার ও চলচ্চিত্র জগতের উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। পাশাপাশি ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামার (এনএসডি) একটি শাখা কলকাতায় চালু হওয়ার সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। এমন উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নতুন শিল্পীদের প্রশিক্ষণ ও বিকাশের আরও বড় সুযোগ তৈরি হবে বলে তাঁর বিশ্বাস। সাক্ষাৎকারের শেষদিকে ফুটবল, মেসি এবং বাঙালির আড্ডা সংস্কৃতির প্রসঙ্গও উঠে আসে। সব মিলিয়ে সঞ্জীব সরকারের কথায় ফুটে উঠেছে একজন শিল্পীর বাস্তব অভিজ্ঞতা, সমাজ নিয়ে উদ্বেগ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ইতিবাচক প্রত্যাশার এক আন্তরিক ছবি।

You cannot copy content of this page