“ঠাম্মাকে হাসপাতালে দেখতে যাওয়ার বদলে আমি সেই টাকাতেও নে’শা করেছি, একটা সময় নে’শা না করলে নিজেকে স্বাভাবিকই মনে হতো না” জীবনের অন্ধকার অধ্যায়ের কথা জানালেন সপ্তর্ষি মৌলিক! নিজের ভুল সিদ্ধান্তে অনেকটা সময় নষ্ট করে, আজও রয়ে গেছে আক্ষেপ! কীভাবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন তিনি?

টেলিভিশন এবং থিয়েটারের জগতে নিজের শক্তিশালী অভিনয়ের জন্য পরিচিত অভিনেতা সপ্তর্ষি মৌলিক। দর্শকের কাছে তিনি যেমন দক্ষ অভিনেতা, তেমনই মাটির কাছাকাছি একজন মানুষ হিসেবেও পরিচিত। মঞ্চে কিংবা ক্যামেরার সামনে প্রতিটি চরিত্রকে জীবন্ত করে তোলার ক্ষমতা তাকে আলাদা করে চেনায়। কিন্তু এই সাফল্যের পথ মোটেও সহজ ছিল না। জীবনের এক সময় তিনি এমন এক অন্ধকার জীবনে তলিয়ে গিয়েছিলেন, যেখান থেকে ফিরে আসা অনেকের পক্ষেই প্রায় অসম্ভব। কলেজ জীবনে পৌঁছে জীবনের লক্ষ্য নিয়ে এক গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন সপ্তর্ষি।

পড়াশোনায় আগ্রহ কমে যেতে থাকে, ভবিষ্যৎ নিয়ে দিশাহীনতা বাড়তে থাকে। সেই সময়ই বন্ধু-বান্ধবের প্রভাব, সিনেমা আর এক ধরনের মানসিক অস্থিরতা তাকে নেশার দিকে ঠেলে দেয়। প্রথমে বিষয়টি ছিল কৌতূহল আর সাময়িক আনন্দের জন্য, কিন্তু ধীরে ধীরে সেটাই হয়ে ওঠে প্রতিদিনের প্রয়োজন। তিনি নিজেই জানিয়েছেন, নেশা করার পর কিছু সময়ের জন্য মনে হতো তিনি সমস্ত চাপ থেকে মুক্ত। এই নেশা ধীরে ধীরে তাকে পুরোপুরি গ্রাস করে ফেলে। প্রায় আড়াই বছর ধরে তিনি বিভিন্ন ধরনের মারাত্মক ড্রাগে আসক্ত ছিলেন। সেই সময়ে তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় কীভাবে পরবর্তী নেশার ব্যবস্থা করা যায়।

পড়াশোনা প্রায় ভেঙে পড়ে, কলেজে ফলাফল খারাপ হতে হতে এমন জায়গায় পৌঁছায় যেখানে অনার্স পর্যন্ত কেটে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। এছাড়াও তিনি জানিয়েছেন, যখন তার ঠাকুমাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল সোডিয়াম-পটাশিয়ামের সমস্যার কারণে, তখন পরিবারের সেই সংকটময় সময়েও তিনি দায়িত্ব না নিয়ে বাবার কাছ থেকে নেওয়া টাকা দিয়ে নেশা করতে চলে যান। নিজেই স্বীকার করেছেন, “ঠাম্মাকে দেখতে যাওয়ার বদলে আমি সেই টাকা দিয়ে নেশা করতে গিয়েছিলাম।” এই ঘটনা শুধু তার আসক্তির গভীরতাই নয়, সেই সময়ে তার মানসিক অবস্থারও ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। প্রথমদিকে পরিবার কিছুই বুঝতে পারেনি।

কারণ ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত খোলামেলা নিজের সব কাজকর্ম বাড়িতে জানাতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে তার আচরণে পরিবর্তন আসে। বারবার মিথ্যে বলা, অকারণে টাকা চাওয়া, এবং অস্বাভাবিক ব্যবহার এসবই পরিবারের মধ্যে সন্দেহ তৈরি করে। নেশার টাকার জন্য চুরি পর্যন্ত করতে হয়েছে তাকে। তিনি নিজেই বলেছেন, সেই সময়টা ছিল যেন “জম্বি স্টেট” যেখানে মাথায় একটাই চিন্তা, পরবর্তী নেশা। নেশা ছিল তার কাছে এক ধরনের পালানোর পথ। জীবনের সমস্যাগুলোকে এড়িয়ে যাওয়ার সহজ উপায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তিনি বুঝতে পারেন, এতে কিছুই সমাধান হচ্ছে না। বরং তিনি আরও গভীর অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছেন।

যখন তিনি নেশা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তার মনে হয়, তিনি অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছেন চারপাশের সবকিছু এগিয়ে গেছে, আর তিনি একা দাঁড়িয়ে রয়েছেন। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা সহজ ছিল না। কিন্তু নিজের ইচ্ছাশক্তি, পরিবারের সমর্থন এবং থিয়েটারের প্রতি ভালোবাসা তাকে নতুন করে বাঁচার পথ দেখায়। নান্দীকারে থিয়েটার শেখার সময় তিনি নতুন করে নিজের জীবনকে গড়ে তুলতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে নেশার অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে আজ তিনি প্রতিষ্ঠিত অভিনেতা।

আরও পড়ুনঃ রেশন পা’চার কাণ্ডে জড়ালেন নুসরত জাহান? অভিনেত্রীর বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ, ডেকে পাঠাল ইডি! এবার কি বিপদে, তৃণমূলের প্রাক্তন তারকা সাংসদ?

সপ্তর্ষি মনে করেন, নেশা নিয়ে চুপ করে না থেকে খোলাখুলি আলোচনা করা জরুরি। কারণ এই সমস্যা আজকের সমাজে ভয়ঙ্করভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। তার মতে, “নেশা থেকে বেরিয়ে আসাটা সবচেয়ে কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়।” একজন সফল অভিনেতার জীবনের এই স্বীকারোক্তি শুধু তার ব্যক্তিগত লড়াই নয়, বরং সমাজের জন্যও এক বড় শিক্ষা, অভিনেতার কথায় অন্ধকার যতই গভীর হোক, ইচ্ছা থাকলে সেখান থেকেও আলোয় ফেরা সম্ভব।

You cannot copy content of this page