বিয়ের পর তাড়িয়ে দেন বাবা, বহুবার ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া তেল জোগাড় করে এনেই তবে রান্না হতো বাড়িতে! অভাবের সংসারে সেই অন্ধকার দিনগুলো পেরিয়ে আজ বাংলা ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম সফল অভিনেতা, খরাজ মুখোপাধ্যায়! হাত ছাড়েননি, কীভাবে স্বামীর পাশে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়েছিলেন স্ত্রী প্রতিভা? কোন সিদ্ধান্তই বদলে দিয়েছিল তাঁর জীবনের মোড়?

বাংলা চলচ্চিত্র, টেলিভিশন এবং নাট্যজগতের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা খরাজ মুখোপাধ্যায়। প্রায় সাড়ে চার দশকের অভিনয় জীবনে তিনি যেমন কমেডি চরিত্রে দর্শকদের হাসিয়েছেন, তেমনই চরিত্রাভিনয় ও নেতিবাচক ভূমিকায় নিজের অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। ‘পাতালঘর’, ‘ভুতের ভবিষ্যৎ’, ‘বেলাশেষে’, ‘প্রজাপতি’ থেকে শুরু করে একাধিক জনপ্রিয় ছবিতে তাঁর অভিনয় আজও দর্শকের মনে বিশেষ জায়গা করে রেখেছে। কিন্তু পর্দার এই সফল অভিনেতার জীবনের শুরুটা মোটেও এত সহজ ছিল না। অভিনয়ের স্বপ্ন বুকে নিয়ে তাঁকে দীর্ঘদিন লড়াই করতে হয়েছে অভাব, অনিশ্চয়তা এবং সংসারের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে। আর সেই লড়াইয়ে তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিলেন স্ত্রী প্রতিভা মুখোপাধ্যায়।

খরাজ মুখোপাধ্যায় নিজেই বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, প্রথম জীবনে তিনি অভিনয়কে পেশা হিসেবে বেছে নিতে পারেননি। সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে চাকরি করতেন। তাঁর বাবা কখনও চাননি তিনি অভিনয় জগতে আসুন। বিয়ের পর পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। অভিনেতার কথায়, বিয়ের পর একসময় বাবা তাঁদের আলাদা হয়ে যেতে বলেছিলেন। পরে বড়দার অনুরোধে বাড়িতে ফিরিয়ে নিলেও একসঙ্গে থাকার সুযোগ মেলেনি। তাঁদের জন্য আলাদা একটি নতুন ফ্ল্যাটের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু সেই ফ্ল্যাটে তখন না ছিল ঠিকমতো মেঝে, না ছিল জানলার কপাট। প্রায় অসম্পূর্ণ অবস্থাতেই সেখানে নতুন সংসার শুরু করেছিলেন খরাজ এবং তাঁর স্ত্রী।

সংসারের সেই কঠিন সময়ের কথা বলতে গিয়ে অভিনেতা জানিয়েছেন, তখন এতটাই আর্থিক টানাপোড়েন ছিল যে রান্না হতো পাম্প স্টোভে। কেরোসিন তেল জোগাড় করাটাও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিভা মুখোপাধ্যায় তখন নতুন চাকরি পেয়েছেন। তিনি এমন জায়গা থেকে ব্যবহৃত কেরোসিন সংগ্রহ করে আনতেন, যেখানে রেললাইনের স্ক্রু পরিষ্কারের কাজে সেই তেল ব্যবহার করা হতো। বহুবার ব্যবহারের পর যে তেল ফেলে দেওয়া হতো, সেটাই বাড়িতে এনে রান্নার কাজে ব্যবহার করতেন তাঁরা। সংসার চালানোর জন্য দু’জনকেই কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। সেই সময় খরাজ চাকরি করার পাশাপাশি ধীরে ধীরে অভিনয় জগতেও নিজের জায়গা তৈরি করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। দিনের পর দিন অনিশ্চয়তার মধ্যেও তাঁরা হাল ছাড়েননি।

এরই মধ্যে তাঁদের পরিবারে আসে নতুন সদস্য। ছেলে জন্মানোর পর দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। সংসার, চাকরি, অভিনয় সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছিলেন খরাজ। একসময় তিনি বুঝতে পারেন, দুই দিক একসঙ্গে টেনে নিয়ে যাওয়া আর সম্ভব হচ্ছে না। তখনই তিনি স্ত্রীর সঙ্গে নিজের দোটানার কথা ভাগ করে নেন। তিনি জানান, হয় চাকরি করতে হবে, নয়তো অভিনয়ে পুরোপুরি মন দিতে হবে। সেই কঠিন মুহূর্তেই প্রতিভা মুখোপাধ্যায় এমন একটি সিদ্ধান্ত নেন, যা খরাজের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তিনি স্বামীকে স্পষ্টভাবে বলেন, চাকরি ছেড়ে দাও, তুমি যেটা ভালোবাসো, সেই অভিনয়কেই বেছে নাও। সংসারের ঝুঁকি, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা সবকিছু জেনেও তিনি স্বামীর স্বপ্নের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

আরও পড়ুনঃ “ডিম খুব অচিরেই পাথরে পরিণত হবে…ডিসকোর্স থেকে সরে যাওয়া একটা জাতির পক্ষে সাংঘাতিক!” সরকার বদলের পর বাংলার বর্তমান রাজনৈতিক চিত্র নিয়ে উদ্বেগ চন্দন সেনের! প্রত্যেক ক্রিয়ার সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়ার কথা মনে করিয়ে, ভবিষ্যৎ নিয়ে কোন আশঙ্কা প্রকাশ করলেন বামপন্থী অভিনেতা?

আজ যখন খরাজ মুখোপাধ্যায় বাংলা বিনোদন জগতের অন্যতম সফল এবং সম্মানিত অভিনেতা, তখন তাঁর এই সংগ্রামের গল্প অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণা। খরাজ নিজেও একাধিকবার বলেছেন, “প্রত্যেক সফল পুরুষের পিছনে একজন নারী থাকেন” এই কথার সত্যতা তিনি নিজের জীবনে অনুভব করেছেন। কারণ যখন চারপাশে অনিশ্চয়তা, অর্থাভাব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ ছিল, তখন তাঁর স্ত্রীই তাঁকে সাহস দিয়েছিলেন নিজের স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরতে। সেই বিশ্বাসের ফলই আজকের সাফল্য। কেরোসিনের তেল জোগাড় করে সংসার চালানো দিনগুলো থেকে শুরু করে বাংলা সিনেমার অন্যতম নির্ভরযোগ্য অভিনেতা হয়ে ওঠার এই পথচলা তাই শুধু খরাজ মুখোপাধ্যায়ের নয়, তাঁর স্ত্রী প্রতিভা মুখোপাধ্যায়েরও সমান লড়াই ও জয়ের গল্প।

You cannot copy content of this page