বিনোদন জগতের আলো-ঝলমলে দুনিয়ার আড়ালে লুকিয়ে থাকে অনেক শিল্পীর না বলা গল্প। দর্শকদের কাছে তাঁরা জনপ্রিয় চরিত্র, হাসি-খুশি মুখ কিংবা একজন সফল অভিনেতা হিসেবেই পরিচিত হন। কিন্তু তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনের সংগ্রাম, উত্থান-পতন কিংবা অকাল প্রয়াণের কাহিনি অনেক সময়ই থেকে যায় অজানা। বাংলা বিনোদন জগতেও এমনই একজন প্রতিভাবান অভিনেতা ছিলেন কুনাল মিত্র, যাঁর অভিনয় দক্ষতা এবং ব্যক্তিত্ব আজও বহু দর্শকের মনে জায়গা করে রয়েছে।
সুপুরুষ চেহারা, সাবলীল অভিনয় এবং রোমান্টিক ব্যক্তিত্বের জন্য অল্প সময়ের মধ্যেই দর্শকদের মন জয় করেছিলেন কুনাল মিত্র। একসময় অনেকেই তাঁকে ‘এ যুগের উত্তম কুমার’ বলেও উল্লেখ করতেন। ছোট পর্দা থেকে বড় পর্দা দুই ক্ষেত্রেই নিজের অভিনয় প্রতিভার ছাপ রেখে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু জীবনের মঞ্চে তাঁর সফর খুব বেশি দীর্ঘ হয়নি। মাত্র ৪৪ বছর বয়সেই আচমকা থেমে যায় তাঁর জীবনযাত্রা। বাংলা টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র জগতের কাছে তাঁর অকাল প্রয়াণ ছিল এক অপূরণীয় ক্ষতি।
১৯৬৫ সালের ৩০ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন কুনাল মিত্র। তাঁর ভালো নাম ছিল বাসব মিত্র। ছোটবেলা থেকেই কিংবদন্তি চলচ্চিত্র পরিচালক দেবকী কুমার বসুর পরিবারের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। সম্পর্কে তিনি ছিলেন দেবকী কুমার বসুর নাতি। পরিচালক দেবকুমার বসুর হাত ধরেই অভিনয় জগতে তাঁর পথচলা শুরু হয়। তাঁর প্রথম ছবি ছিল ‘অনুভব’। সেই ছবিতেই বাসব মিত্র থেকে তিনি হয়ে ওঠেন কুনাল মিত্র। অভিনয়ে আসার আগে তিনি ভারতীয় রেলের চাকরিও করেছিলেন এবং দীর্ঘদিন থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
মঞ্চে অভিনয়ের অভিজ্ঞতাই পরবর্তীকালে তাঁকে একজন দক্ষ অভিনেতা হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। প্রথম ছবির পর আলফা বাংলার জনপ্রিয় কমেডি ধারাবাহিক ‘জম্বে মজা’-তে অভিনয়ের সুযোগ পান কুনাল। এরপর ‘কুয়াশা যখন’ ধারাবাহিকে অভিনয় করে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। ধীরে ধীরে বাংলা টেলিভিশনের অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন তিনি। পরে বড় পর্দাতেও একাধিক ছবিতে অভিনয় করেন। ‘সম্প্রদান’, ‘সংশয়’, ‘সেদিন দুজনে’, ‘রাঙ্গামাটি’, ‘প্রিয়জন’, ‘আলো’, ‘খেলাঘর’ এবং ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’-এর মতো ছবিতে তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়। অভিনয়ের পরবর্তী সময়ে তাঁর মধ্যে অনেকেই মহানায়ক উত্তম কুমারের অভিনয় ও ব্যক্তিত্বের ছায়া খুঁজে পেতেন।
সেই কারণেই উত্তম কুমারের জনপ্রিয় ছবির টেলি-রিমেকগুলিতে তাঁকে মহানায়কের চরিত্রে দেখা গিয়েছিল। দর্শকদের একাংশ তাঁকে ‘এ যুগের উত্তম কুমার’ বলেও অভিহিত করতে শুরু করেন। তবে জীবনের শেষ কয়েক বছরে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন অনেকটাই অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছিল বলে জানা যায়। অতিরিক্ত খাওয়া-দাওয়া, শরীরচর্চার অভাব এবং মদ্যপানের কারণে তাঁর শারীরিক গঠনে বড় পরিবর্তন আসে। ফলে অভিনয়ের সুযোগও ধীরে ধীরে কমতে থাকে। ২০০৯ সালের ২১ জানুয়ারি ‘উৎসবের রাত্রি’ ধারাবাহিকের শুটিং চলাকালীন আচমকাই বুকে তীব্র ব্যথা অনুভব করেন তিনি।
আরও পড়ুনঃ “অনেক প্রেম করেছি…কসাই হয়ে মাং’স কেটেছি, এবার মানুষ কাটার পালা!” পরিচালক পাভেলকে উদ্দেশ্য করে, জন্মদিনে সৌম্য মুখার্জির বি*স্ফোরক পোস্টে ঘিরে তোলপাড় নেটপাড়া! হঠাৎ কীসের ইঙ্গিত দিলেন অভিনেতা?
কিছুক্ষণের মধ্যেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শুটিং সেটেই তাঁর মৃত্যু হয়। তখন তাঁর বয়স মাত্র ৪৪ বছর। সেই সময় তিনি ‘ছয় ছুটি’ ছবির কাজও করছিলেন, যা আর শেষ করে যেতে পারেননি। তাঁর অকাল প্রয়াণে স্ত্রী ও দুই পুত্রসহ গোটা বাংলা বিনোদন জগত শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েছিল। আজও কুনাল মিত্রকে স্মরণ করলে দর্শকদের মনে একটাই প্রশ্ন জাগে আরও কিছুটা যত্ন নিলে কি বাংলা অভিনয় জগৎ আরও অনেক বছর তাঁর অসাধারণ অভিনয় উপভোগ করতে পারত?






