পিতৃ দিবসে যখন বহু বাবা সন্তানের ভালোবাসার কথা শুনে আবেগে ভাসছেন, তখন এক লড়াকু বাবার গল্পও শোনা উচিৎ। একসময় টলিউডের জনপ্রিয় শিশুশিল্পী হিসেবে পরিচিত ছিলেন ‘মাস্টার রিন্টু’ (Master Rintu)। যার আসল নাম সজল দে। একসময় বাংলা ছবির দর্শকদের কাছে তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রিয় মুখ। একের পর এক ছবিতে অভিনয় করে অল্প বয়সেই জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু আজ সেই অভিনেতার জীবন ঘুরে গিয়েছে সম্পূর্ণ অন্য পথে। অভিনয়ের আলো থেকে অনেক দূরে দাঁড়িয়ে এখন তাঁকে লড়াই করতে হচ্ছে সংসার, ভবিষ্যৎ এবং সন্তানের জন্য।
তাঁর অভিনয় জীবন শুরু হয়েছিল পরিচালক অঞ্জন চৌধুরীর ছবি ‘গুরুদক্ষিণা’র মাধ্যমে। প্রথমে একটি ছোট সংলাপ দিয়ে পথচলা শুরু হলেও খুব দ্রুতই তিনি পরিচালকদের নজরে চলে আসেন। এরপর একের পর এক ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পেতে থাকেন। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি প্রায় ১০০টির বেশি ছবিতে কাজ করেন। তাপস পাল, শতাব্দী রায়, সন্ধ্যা রায়ের মতো জনপ্রিয় তারকাদের সঙ্গে পর্দা ভাগ করে নিয়েছিলেন তিনি। শিশুশিল্পী হিসেবে তাঁর জনপ্রিয়তাও ছিল চোখে পড়ার মতো।
সবই ঠিক চললেও, মাধ্যমিক পরীক্ষার পর তাঁর জীবনে শুরু হয় কঠিন সময়। বাবার অসুস্থতা এবং পরিবারের আর্থিক সমস্যার কারণে অভিনয় জগৎ থেকে ধীরে ধীরে সরে যেতে বাধ্য হন তিনি। নিয়মিত আয়ের জন্য অন্য পেশার দিকে মন দিতে হয়। দীর্ঘদিন ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করলেও কঠিন সময়ে খুব বেশি মানুষ পাশে দাঁড়াননি বলে আক্ষেপ তাঁর। সেই অভিমান এখনও রয়ে গেছে অভিনেতার মনে। কারণ, যে জগত তাঁকে পরিচিতি দিয়েছিল, সেই জগত থেকেই নিজেকে একেবারেই দূরে সরে যেতে দেখেছেন তিনি।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে সজল বলেন, যে ইন্ডাস্ট্রিকে তিনি এত ভালো অভিনয় উপহার দিয়েছেন আজ তার কঠিন সময় তাকেই ভুলে গিয়েছে সবাই। তাঁর আরও আক্ষেপ প্রতিভা এবং অভিনয়ের গুণ না থাকলেও আজকাল অনেকেই সুযোগ পেয়ে যাচ্ছেন, যেখানে তার মতো অনেক শিল্পীরাই রয়ে যাচ্ছেন অবহেলায়। বছর কয়েক আগে জিতের ছবিতে পার্শ্ব চরিত্রে তাঁকে দেখা গেলেও তেমন বড় ছবির অংশ হতে পারেননি তিনি। ফলে পেশা বদল করেই জীবন এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে। তবে পেশাগত সংগ্রামের থেকেও বড় লড়াই চলছে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে।
বর্তমানে তিনি একটি কন্যাসন্তানের বাবা। কিন্তু তাঁর মেয়ে দুর্ভাগ্যক্রমে অটিজমে আক্রান্ত। বর্তমানে সন্তানের চিকিৎসা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রতিনিয়ত লড়াই করে চলেছেন তিনি। মেয়ের বয়স সাত বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও বাবাকে ডাকতে পারেনি সে। এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন অভিনেতা। পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে সমস্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে সন্তানের জন্যই প্রতিদিন নতুন করে লড়াই করার শক্তি পান বলে জানিয়েছেন।
আরও পড়ুনঃ “এখনও অভ্যাসটা যায়নি, সময় বদলেছে কিন্তু একটা জিনিস বদলায়নি…” ফাদার্স ডে-তে বাবা অঞ্জন চৌধুরীকে স্মরণ করে আবেগঘন চুমকি চৌধুরী! কোন আক্ষেপ আজও তাড়া করে বেড়ায় অভিনেত্রীকে?

তাঁর এই কথার মধ্যেই ধরা পড়ে এক বাবার কষ্ট, আশা এবং অদম্য মানসিকতার ছবি। অভিনয় জগত থেকে অনেকটাই দূরে থাকলেও অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা এখনও অটুট রয়েছে তাঁর। তিনি বিশ্বাস করেন, একদিন হয়তো আবারও কোনও পরিচালক বা প্রযোজক তাঁর প্রতিভার উপর ভরসা করবেন। সেই সুযোগ পেলে আবারও নিজের অভিনয় দক্ষতা দর্শকদের সামনে তুলে ধরতে প্রস্তুত তিনি। তাই সমস্ত প্রতিকূলতার মাঝেও স্বপ্ন দেখা বন্ধ করেননি একসময়ের জনপ্রিয় শিশুশিল্পী মাস্টার রিন্টু।






