ভালোবাসা হার মানায় অভাবকেও? বাংলা থিয়েটার, টেলিভিশন ও সিনেমার জগতে সুপরিচিত মুখ সুজন নীল মুখোপাধ্যায়, যাকে অধিকাংশ মানুষ ‘নীল’ নামেই চেনেন। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তিনি অভিনয়ের জগতে নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছেন। মঞ্চে তাঁর শক্তিশালী উপস্থিতি যেমন দর্শকদের মুগ্ধ করেছে, তেমনই ছোটপর্দায় তাঁর সহজ-সরল অভিনয় তাঁকে ঘরের মানুষ করে তুলেছে। বিশেষ করে শিশুদের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘লক্ষ্মীছানা’-র সঞ্চালক হিসেবে তিনি এক প্রজন্মের কাছে অত্যন্ত প্রিয় হয়ে ওঠেন। অভিনয় তাঁর কাছে শুধু পেশা নয়, একেবারে জীবনযাত্রার অংশ, এই কথাই বারবার উঠে আসে তাঁর কথায় ও কাজে।
নীলের বেড়ে ওঠা একেবারেই মধ্যবিত্ত পরিবেশে। হাওড়ার শিবপুরে জন্ম, পরে কলকাতায় বড় হওয়া, এই যাত্রাপথে ছোটবেলা থেকেই থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন তিনি। তাঁর বাবা ছিলেন থিয়েটারের মানুষ, ফলে বাড়ির পরিবেশই ছিল সংস্কৃতিমনস্ক। তবে সেই সঙ্গে ছিল আর্থিক টানাপোড়েনও। ছোটবেলায়ই তিনি বুঝে গিয়েছিলেন, এই জগতে টিকে থাকতে হলে শুধু প্রতিভা নয়, দরকার অসীম ধৈর্য ও পরিশ্রম। ধীরে ধীরে থিয়েটার থেকে টেলিভিশন, তারপর সিনেমা, এইভাবে তাঁর ক্যারিয়ার বিস্তৃত হয়েছে।
ব্যক্তিগত জীবনের কথায় এলে, নীলের জীবনের একটি বড় অধ্যায় তাঁর স্ত্রী অভিনেত্রী নিবেদিতা মুখোপাধ্যায় (দাসগুপ্ত)-র সঙ্গে সম্পর্ক। থিয়েটারের কাজের সূত্রেই তাঁদের আলাপ, তারপর ধীরে ধীরে সেই সম্পর্ক গভীর হয়। ১৯৯৮ সালে তাঁরা বিয়ে করেন। তবে এই সম্পর্কটা শুধু স্বামী-স্ত্রীর নয়, বরং একে অপরের সহযোদ্ধা হিসেবেও তাঁরা পাশে থেকেছেন। অভিনয় জগতের অনিশ্চিত জীবনেও তাঁদের বোঝাপড়া ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কই ছিল সবচেয়ে বড় শক্তি।
বিয়ের শুরুর সময়টা কিন্তু মোটেও সহজ ছিল না। নীল নিজেই বলেছেন, সেই সময় তাঁদের জীবনে ছিল চরম অনিশ্চয়তা। আলাদা করে নিজেদের একটা ‘স্পেস’ তৈরি করার জন্য পরিবার থেকে দূরে থাকতে হয়েছিল। তখনকার সমাজে ‘লিভ ইন’ সম্পর্ক নিয়ে অনেক কথা হলেও, তাঁরা সেই পথে হাঁটেননি। বাড়িওয়ালার চাপ ছিল “বিয়ে করবে তো? সিঁদুর পরবে তো?” এই ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে বারবার। কিন্তু বাস্তবতা ছিল কঠিন বাড়িতে ফ্রিজ নেই, ঠান্ডা জল খাওয়ার সুযোগ নেই, খাবার সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেই, এসি তো দূরের কথা। একটি ছোট্ট টিভিই ছিল একমাত্র বিলাসিতা। সেই জীবন যেন অনেকটা সিনেমার গল্পের মতোই।
থিয়েটার থেকে তখন কোনো স্থায়ী আয় ছিল না। রিহার্সালের নির্দিষ্ট সময় পাওয়াও কঠিন ছিল। নীল বলেন, “ডেটই পাওয়া যেত না, অনেক দলকে একসঙ্গে ব্র্যাকেটে ফেলে রাখা হত” যার পেছনে তিনি রাজনৈতিক প্রভাবও দেখেছেন। এই পরিস্থিতিতে সংসার চালানো ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক সময় কাজের সুযোগ ছাড়তে হয়েছে, আবার কখনো টাকার জন্য অন্য মাধ্যমের দিকে যেতে হয়েছে। তবুও তিনি বলেন, তাঁর লোভ কখনো বেশি ছিল না, শুধু ভালো অভিনয় করার ইচ্ছেটাই তাঁকে চালিত করেছে। এই কঠিন সময়ের মধ্যেই তাঁরা নিজেদের সম্পর্ককে ধরে রেখেছেন এবং ধীরে ধীরে এগিয়ে গেছেন।
আরও পড়ুন: “সবাই বলেছিল তুমি পারবে না, কিন্তু আমি বলেছিলাম…” নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের কয়েক ঘণ্টা আগেই আত্মবিশ্বাসী পোস্ট ইমন চক্রবর্তীর! আচমকা কোন জয়ে ইঙ্গিত গায়িকার?
আজকের অবস্থানে পৌঁছে নীল সেই পুরনো দিনের কথা ভুলে যাননি। বরং তিনি মনে করেন, সেই সংগ্রামই তাঁকে তৈরি করেছে। তাঁর কথায়, “সংগ্রাম না থাকলে হয়তো আজকের আমি হতাম না।” স্ত্রী নিবেদিতার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এখনো বন্ধুত্বপূর্ণ ও দৃঢ়, আর তাঁদের ছেলে বড় হচ্ছে নিজের পছন্দের পথে। নীলের জীবনকাহিনী প্রমাণ করে, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক চাপ, পেশাগত বাধা সবকিছু পেরিয়েও যদি ধৈর্য ও ভালোবাসা থাকে, তাহলে সফলতা একদিন না একদিন আসবেই।






