বাংলা সিনেমার ইতিহাসে উত্তম কুমার এবং সুচিত্রা সেনের জুটির জনপ্রিয়তা আজও একই রকম উজ্জ্বল। ১৯৫৩ সালে ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবির মাধ্যমে প্রথমবার একসঙ্গে বড়পর্দায় দেখা যায় তাঁদের। এরপর দীর্ঘ অভিনয় জীবনে সুচিত্রা সেন মোট ৬০টি ছবিতে অভিনয় করেন, যার মধ্যে ৩০টি ছবিতেই তাঁর বিপরীতে ছিলেন উত্তম কুমার। একের পর এক সফল ছবি উপহার দিয়ে তাঁরা বাংলা চলচ্চিত্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় রোম্যান্টিক জুটিতে পরিণত হন। পর্দায় তাঁদের রসায়ন যেমন দর্শকদের মুগ্ধ করেছে, তেমনই ক্যামেরার বাইরেও তাঁদের সহজ, আন্তরিক বন্ধুত্বের নানা স্মৃতি আজও সমানভাবে আলোচিত। সেই সম্পর্কেরই এক মজার ঘটনা উঠে এসেছিল মহানায়কের ভাই অভিনেতা তরুণ কুমারের স্মৃতিচারণে।
২০১০ সালে প্রকাশিত একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় তরুণ কুমার সেই ঘটনার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, একদিন স্টুডিওর একটি ফ্লোরে ‘ফরিয়াদ’ ছবির শুটিং করছিলেন সুচিত্রা সেন। ঠিক পাশের ফ্লোরেই অন্য একটি ছবির কাজে ব্যস্ত ছিলেন উত্তম কুমার। সেই সময় হঠাৎ করেই সুচিত্রা সেন মহানায়কের শুটিং ফ্লোরে হাজির হন। সকলের সামনেই তিনি হেসে প্রশ্ন করেন, “কী উত্তম, শুটিং করছো?” উত্তম কুমার অবাক হয়ে বলেন, “হ্যাঁ, কেন বলো তো?” এরপর কোনও উত্তর না দিয়েই তিনি ছবির পরিচালককে ডেকে বলেন, “ফ্লোরের সব লাইটগুলো একটু বন্ধ করে দিন তো!” তারপর উত্তমের দিকে তাকিয়ে মনে করিয়ে দেন, “তোর সঙ্গে আজ ডায়মন্ডহারবারে যাওয়ার কথা ছিল না? আর তুই এখানে শুটিং করছিস?”
হঠাৎ এমন পরিস্থিতিতে পড়ে খানিক অপ্রস্তুত হয়ে যান মহানায়ক। উপস্থিত সকলের সামনে বিষয়টি সামাল দিতে তিনি সুচিত্রা সেনকে শান্তভাবে বলেন, “আচ্ছা তুমি এখন তোমার ফ্লোরে যাও, আমি শটটা দিয়ে নিই। তারপর তোমার মেকআপ রুমে গিয়ে একসঙ্গে চা খাব।” তবে মহানায়িকা সহজে ছাড়ার মানুষ ছিলেন না। যাওয়ার আগে তিনি হেসে বলেছিলেন, “না এলে কিন্তু খুব খারাপ হয়ে যাবে!” সেই কথার মধ্যেও ছিল দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের সহজ খুনসুটি। শুটিং চলতে থাকলেও সকলেই বুঝতে পারছিলেন, দুই তারকার এই কথোপকথনের মধ্যে কোনও অস্বস্তি নয়, বরং ছিল নিখাদ আন্তরিকতা।
কিছুক্ষণ পরে উত্তম কুমারের শট শেষ হতে দেরি হওয়ায় আবারও তাঁর ফ্লোরে চলে আসেন সুচিত্রা সেন। এবার একটু রাগের ভান করে মহানায়ককে এক পাশে ডেকে বলেন, “কী রে, তুই এলি না? নায়িকার সঙ্গে খুব প্রেম হচ্ছে বুঝি?” উত্তম কুমার কিছু বলার আগেই সুচিত্রা সেন তাঁর ঠোঁটে হাত দিয়ে বলেন, “আর একটা কথাও নয়। বাইরে আমার গাড়ি রেডি আছে, চল দু’জনে ডায়মন্ড হারবার ঘুরে আসি।” চারপাশে এত মানুষের সামনে এমন কথা শুনে মহানায়ক আরও অস্বস্তিতে পড়ে যান। তখনই তিনি বন্ধুকে বোঝানোর চেষ্টা করেন, “রমা, তুই পাগল হয়েছিস নাকি? এতে তোর বদনাম হয়ে যাবে। খবরের কাগজে লিখবে উত্তম সুচিত্রাকে নিয়ে পালিয়েছে!”
মহানায়কের সেই আশঙ্কার জবাবও দিয়েছিলেন সুচিত্রা সেন নিজের স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে। তিনি হেসে বলেন, “একটু বদনাম হোক না, ভালোই তো হবে!” তরুণ কুমারের কথায়, পুরো ঘটনাটাই ছিল শুধুই মজার ছলে বন্ধুর সঙ্গে খুনসুটি করার চেষ্টা। সুযোগ পেলেই সুচিত্রা সেন এভাবেই উত্তম কুমারকে বিব্রত করে মজা নিতেন। তাঁদের মধ্যে কোনও দূরত্ব বা জড়তা ছিল না। বরং দীর্ঘদিনের বিশ্বাস, শ্রদ্ধা এবং বন্ধুত্বের সম্পর্কই এমন মুহূর্তগুলোকে আরও স্বাভাবিক করে তুলেছিল। স্টুডিওর অনেকেই এই ধরনের খুনসুটির সাক্ষী ছিলেন।
আরও পড়ুনঃ ওখানে খুব মশা! যোগ্যতা দিয়ে থাকা আরবানার খুঁত ধরলেন সুজয় প্রসাদ! ‘কলকাতার রাস্তায় থাকতে গেলেও কি এবার যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হবে?’ রচনাকে প্রশ্ন ছুঁড়লেন তিনি
পর্দায় তাঁরা ছিলেন বাংলা সিনেমার সেরা প্রেমিক-প্রেমিকা। কিন্তু ক্যামেরার আড়ালে তাঁদের সম্পর্কের ভিত ছিল গভীর বন্ধুত্ব, পারস্পরিক সম্মান এবং অকৃত্রিম আন্তরিকতা। সেই কারণেই বহু দশক পেরিয়ে গেলেও উত্তম কুমার এবং সুচিত্রা সেনকে ঘিরে এমন ছোট ছোট স্মৃতিও আজও সমান আগ্রহ নিয়ে পড়েন অনুরাগীরা। তাঁদের অভিনয় যেমন বাংলা চলচ্চিত্রকে সমৃদ্ধ করেছে, তেমনই ব্যক্তিগত সম্পর্কের এই মানবিক মুহূর্তগুলোও তাঁদের কিংবদন্তি হয়ে ওঠার অন্যতম কারণ। আজও টলিউডের ইতিহাসে তাঁরা একমাত্র ‘মহানায়ক’ এবং ‘মহানায়িকা’ হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে রয়েছেন।






