“অনেকেরই একটা-আধটা কাজ করে ভাবে ‘দারুণ করলাম’, ‘ফাটিয়ে দিলাম’…আমায় সিট এগিয়ে না দিলে আমি বসি না, প্রয়োজনে নিজের চেয়ারটা…” ৩০ বছর ইন্ডাস্ট্রিকে দিয়েছেন নিজের সবটা, তবুও কপালে জুটেছে ‘এক্সপেনসিভ’ তকমা! থিয়েটার থেকে যাত্রার মঞ্চে নতুন পথচলা, ইন্ডাস্ট্রির অন্দরমহল নিয়ে অকপট তুলিকা বসু!

প্রায় তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে অভিনয় জগতের সঙ্গে যুক্ত তুলিকা বসু। টেলিভিশন, সিনেমা, থিয়েটার, একের পর এক মাধ্যমে নিজের অভিনয়ের ছাপ রেখে গিয়েছেন তিনি। সম্প্রতি আবার যাত্রার মঞ্চেও নিয়মিত কাজ শুরু করেছেন অভিনেত্রী। দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে তিনি তুলে ধরেছেন বর্তমান ইন্ডাস্ট্রির নানা বাস্তব ছবি, কাজের অনিশ্চয়তা, যাত্রার প্রতি তাঁর টান এবং একজন শিল্পী হিসেবে নিজের ভাবনার কথা। তাঁর বক্তব্যে যেমন ছিল আত্মবিশ্বাস, তেমনই ছিল পেশাকে ঘিরে কিছু আক্ষেপও।

তুলিকা জানান, গত বছর প্রথমবার যাত্রায় অভিনয় করার অভিজ্ঞতা তাঁর এতটাই ভালো লেগেছিল যে, এ বছরও সেই পথেই হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর কথায়, যাত্রার মাধ্যমে বাংলার নানা প্রান্তের মানুষের সঙ্গে কাছ থেকে মিশে তাঁদের ভাষা, সংস্কৃতি এবং জীবনকে অনুভব করার সুযোগ মিলছে। একই সঙ্গে কাঠের মঞ্চে দাঁড়িয়ে সরাসরি দর্শকের প্রতিক্রিয়া পাওয়ার যে আনন্দ, তা তিনি বহুদিন ধরেই মিস করছিলেন। কলকাতায় শুধুমাত্র থিয়েটার করে টিকে থাকা কঠিন বলেই যাত্রা তাঁর কাছে শিল্পচর্চা চালিয়ে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। তিনি আরও বলেন, সময়ের সঙ্গে যাত্রার উপস্থাপনাও অনেক আধুনিক হয়েছে এবং কাজের ধরনেও এসেছে পরিবর্তন।

বর্তমান ইন্ডাস্ট্রির কাজের পরিস্থিতি নিয়েও খোলাখুলি কথা বলেছেন অভিনেত্রী। তাঁর মতে, এখন শিল্পীর সংখ্যা অনেক বেশি হলেও কাজের সুযোগ তুলনামূলকভাবে কমে গিয়েছে। তাই প্রতিযোগিতাও আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। বহু বছর কাজ করার পর আজ তাঁকে অনেক সময়ই শুনতে হয় তিনি নাকি ‘এক্সপেনসিভ’। তবে এই মন্তব্যে কষ্ট পাওয়ার বদলে তিনি বলেন, এটাকে তিনি নিজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার স্বীকৃতি বলেই মনে করেন। একই সঙ্গে তাঁর পর্যবেক্ষণ, আগে একটি ধারাবাহিকে অনেক বেশি সিনিয়র শিল্পীকে একসঙ্গে দেখা যেত, এখন সেই ছবিটা বদলে গিয়েছে। বাজেট এবং পরিকল্পনার কারণেই অনেক কিছু নতুনভাবে ভাবা হচ্ছে।

নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়েও নিজের মত প্রকাশ করেছেন তুলিকা। তাঁর বিশ্বাস, অভিনয় এমন একটি শিল্প যেখানে শেখার কোনও শেষ নেই। একটি বা দু’টি কাজ করে নিজেকে সফল ভেবে নেওয়া ঠিক নয়। বরং প্রতিটি দৃশ্যের পরই মনে হওয়া উচিত, আরও ভালো করা যেত। এই মানসিকতাই একজন শিল্পীকে এগিয়ে নিয়ে যায়। পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়া নিয়েও তিনি নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। তাঁর মতে, সেখানে নিজের মনের কথা সবসময় বলা যায় না। তাই অযথা বিতর্কে জড়ানোর বদলে তিনি নিজের নীতিতেই বিশ্বাস করেন। তাঁর ভাষায়, “সিট এগিয়ে না দিলে আমি বসি না, প্রয়োজনে চেয়ারটা সঙ্গে নিয়ে যাই।”

আরও পড়ুনঃ যেখানে ন্যায়ের প্রশ্ন, সেখানে বরাবরের প্রতিবাদী কণ্ঠ নীরব কেন? নতুন প্রজন্মের পোশাক থেকে দাম্পত্য জীবন, প্রায় সব সামাজিক ইস্যুতেই সরব মমতা শঙ্কর! কিন্তু দিল্লিতে নিট পরীক্ষায় দুর্নী’তি ঘিরে ছাত্রদের আন্দোলনের দেশজুড়ে উদ্বেগ, কোনও প্রতিক্রিয়া নেই তাঁর? শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের লড়াইয়ে বর্ষীয়ান অভিনেত্রীর নীরবতা ঘিরেই উঠছে প্রশ্ন!

অভিনেত্রী আরও মনে করেন, যাত্রাকে এখনও অনেকেই প্রথম সারির বিনোদন মাধ্যম হিসেবে দেখতে চান না, কিন্তু সেই ধারণা বদলানো প্রয়োজন। তাঁর মতে, যাত্রায় অভিনয় করা অত্যন্ত কঠিন এবং এই মাধ্যমেরও যথেষ্ট সম্মান প্রাপ্য। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ইন্ডাস্ট্রির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা থাকলেও তিনি আশাবাদী। ভালো সময় আবার ফিরবে বলেই তাঁর বিশ্বাস। পরিবর্তনকে শুধু সমাজে নয়, নিজের মধ্যেও ধরে রাখার প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি মনে করেন। একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় লড়াই অন্য কারও সঙ্গে নয়, বরং নিজের সঙ্গে— এই বিশ্বাস নিয়েই আজও অভিনয়ের পথেই এগিয়ে চলেছেন তুলিকা বসু।

You cannot copy content of this page