নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর কর্মকাণ্ডে সামিল হয়েছিলেন মহানায়ক! ১৯৪৬-এর দা*ঙ্গায় গু’ন্ডাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো থেকে অর্থ সংগ্রহ, অ*স্ত্র হাতে লড়াই না করেও দেশ ও বিপ্লবীদের কীভাবে সাহায্য করেছিলেন উত্তম কুমার? অনবদ্য অভিনয়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকা তাঁর এই দেশপ্রেমের কাহিনি জানতেন? আজও কেন আলোচনার বাইরেই থেকে গেল এই অধ্যায়?

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে মহানায়ক উত্তম কুমার এমন এক নাম, যার জনপ্রিয়তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একই রকম উজ্জ্বল। রোম্যান্টিক নায়ক হিসেবে তাঁর অভিনয়, ব্যক্তিত্ব ও পর্দার উপস্থিতি আজও বাঙালির কাছে বিশেষ আবেগের। কিন্তু অভিনয়ের বাইরেও উত্তম কুমারের জীবনের এমন কিছু অধ্যায় রয়েছে, যা তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত। ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের পাশাপাশি গান ও দেশপ্রেমের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। এমনকি দেশাত্মবোধক গানও লিখতেন ও সুর করতেন তিনি। ১৯৪৫ সালের ২৩ জানুয়ারি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মদিনে কলকাতায় একটি প্রভাত ফেরিতে গাওয়া একটি গানও লিখেছিলেন তরুণ অরুণ চট্টোপাধ্যায়, যিনি পরবর্তীকালে মহানায়ক উত্তম কুমার নামে পরিচিত হন।

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর প্রতি উত্তম কুমারের শ্রদ্ধা ছিল গভীর। নিজের স্মৃতিচারণে তিনি লিখেছিলেন, সেই সময় তাঁদের একমাত্র সহায় ছিলেন নেতাজি এবং তাঁর কর্মকাণ্ড থেকেই তাঁরা নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতেন। কিশোর উত্তম সরাসরি অস্ত্র হাতে বিপ্লবীদের সঙ্গে লড়াই করেননি ঠিকই, কিন্তু দেশের জন্য কিছু করার তাগিদ তাঁর মধ্যে সবসময়ই ছিল। ১৯৪৬ সালের গোড়ার দিকে তিনি বিপ্লবী ও অনুশীলন সমিতির সদস্য সতীশ চন্দ্র বসুর কাছে গিয়ে জানতে চান, দেশের জন্য বা তাঁদের সংগঠনের জন্য তিনি কী করতে পারেন। সেই সময় দিল্লিতে আজাদ হিন্দ ফৌজের সেনাদের বিচার চলছিল এবং মামলার খরচ চালাতে অর্থের প্রয়োজন ছিল।

এই পরিস্থিতিতে উত্তম কুমারের উদ্যোগে লুনার ক্লাবের পক্ষ থেকে একটি চ্যারিটি শো আয়োজন করা হয়। সেখানে মঞ্চস্থ হয় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ’। সেই অনুষ্ঠানের টিকিট বিক্রি করে প্রায় ১৭০০ টাকা সংগ্রহ করা হয়। সেই সময়ের হিসেবে এই অর্থের মূল্য ছিল যথেষ্ট। সংগৃহীত টাকা সতীশ চন্দ্র বসুর হাতে তুলে দেন উত্তম। তখনও তিনি চলচ্চিত্রের মহানায়ক হয়ে ওঠেননি, ছিলেন সাধারণ এক তরুণ। পরিবারের আর্থিক দায়িত্বও তাঁর কাঁধে ছিল এবং সংসার চালাতে চাকরিও করতে হয়েছিল তাঁকে। তবুও দেশের জন্য কিছু করার ইচ্ছা থেকে তিনি পিছিয়ে যাননি। উত্তম কুমারের সাহসিকতার আরেকটি ঘটনা জড়িয়ে রয়েছে ১৯৪৬ সালের কলকাতার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার অস্থির সময়ের সঙ্গে।

‘দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’-এর পর শহরের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। সেই সময় তাঁর এলাকার রাস্তায় কিছু ট্যাক্সিচালকের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে হেনস্থা ও টাকা আদায়ের অভিযোগ ছিল। এক রাতে বন্ধুদের সঙ্গে সেই রাস্তা দিয়ে ফেরার সময় উত্তমের পথ আটকানো হয় এবং টাকা চাওয়া হয়। পরিস্থিতি দেখে তিনি প্রতিবাদ করেন। এক পর্যায়ে উত্তম ও তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে ওই ব্যক্তিদের ধস্তাধস্তি শুরু হয়। সংঘর্ষে উত্তমের মাথাতেও চোট লাগে। অর্থাৎ পর্দায় তিনি যতই রোম্যান্টিক নায়ক হিসেবে পরিচিত হন না কেন, বাস্তব জীবনেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস তাঁর ছিল।

আরও পড়ুনঃ ক্যাপ্টেন হওয়ার স্বপ্ন ফের অধরা! আবারও ক্যাপ্টেন্সি টাস্ক থেকে বাদ রাজবীর? এত শক্তিশালী খেলোয়াড় হয়েও কেন অন্যান্য প্রতিযোগীদের সঙ্গে লড়াইয়ে বারবার হেরে যাচ্ছেন তিনি? এবার আটকে গেলেন কোন ফাঁদে? বাড়ছে উত্তেজনা, ‘বিগ বস বাংলা’র নতুন পর্বে কী হতে চলেছে?

উত্তম কুমারের এই ঘটনাগুলি তাঁর পরিচিত রোম্যান্টিক নায়ক-ভাবমূর্তির বাইরে এক অন্য মানুষকে সামনে আনে। দেশপ্রেম, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ তাঁর জীবনের এই দিকগুলি আজও অনেকের কাছে অজানা। নেতাজির আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে দেশের জন্য কিছু করার চেষ্টা থেকে শুরু করে বিপ্লবীদের সাহায্যের জন্য অর্থ সংগ্রহ এবং দাঙ্গার সময় অন্যায়ের প্রতিবাদ সব মিলিয়ে মহানায়ক উত্তম কুমারের জীবন ছিল শুধু রুপোলি পর্দার সাফল্যের গল্প নয়। তাঁর এই মানবিক ও সাহসী অধ্যায়ও বাঙালির কাছে সমানভাবে স্মরণীয়।

You cannot copy content of this page