বিনোদন জগতের তারকাদের জীবন বাইরে থেকে যতটা ঝলমলে মনে হয়, বাস্তবে তার আড়ালে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য সংগ্রাম, সুখ-দুঃখ, হারিয়ে যাওয়া মানুষদের স্মৃতি এবং ব্যক্তিগত বেদনার গল্প। দর্শকরা সাধারণত তাঁদের অভিনয়, জনপ্রিয়তা কিংবা সাফল্যের কাহিনী জানলেও, জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তগুলোর কথা খুব কমই সামনে আসে। অনেক সময় কোনও সাক্ষাৎকারে বা আড্ডার আসরে শিল্পীরা এমন কিছু অভিজ্ঞতার কথা শোনান, যা শুধু তাঁদের জীবনের নয়, সাধারণ মানুষের মনেও গভীর ছাপ ফেলে যায়। ঠিক তেমনই এক আবেগঘন স্মৃতির কথা সম্প্রতি ভাগ করে নিয়েছেন অভিনেতা অম্বরীশ ভট্টাচার্য।
বাংলা বিনোদন জগতের পরিচিত মুখ অম্বরীশ ভট্টাচার্য তাঁর অভিনয় দক্ষতা এবং সহজ-সরল ব্যক্তিত্বের জন্য দর্শকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। হাস্যরসাত্মক চরিত্র থেকে শুরু করে গম্ভীর অভিনয় সব ক্ষেত্রেই নিজের ছাপ রেখেছেন তিনি। তবে পর্দার বাইরের অম্বরীশ একজন অত্যন্ত সংবেদনশীল মানুষ। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে নিজের ব্যক্তিগত জীবনের নানা অভিজ্ঞতার কথা তিনি অকপটে তুলে ধরেছেন। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বাবাকে নিয়ে বলা তাঁর কিছু কথা শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছেন অনেকেই।
অম্বরীশ জানান, তাঁর বাবা জীবনের শেষ সময়ে কোনও বড় সঞ্চয় রেখে যেতে পারেননি। বাবার মৃত্যুর পর ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে মাত্র সাড়ে সাত হাজার টাকা পড়ে থাকতে দেখেছিলেন তিনি। জীবনের দীর্ঘ পথচলার শেষে এটাই ছিল তাঁর বাবার আর্থিক সঞ্চয়। কিন্তু সেই বিষয়টি নিয়ে বাবার কোনও আক্ষেপ ছিল না বলেই মনে করেন অভিনেতা। কারণ তিনি নিজের মতো করে জীবন উপভোগ করে বেঁচেছিলেন। তবে সেই জীবনের মূল্য তাঁকে শেষ পর্যন্ত চরম শারীরিক কষ্টের মধ্য দিয়েই দিতে হয়েছিল। অম্বরীশ জানান, তাঁর বাবা সিরোসিস অফ লিভারে আক্রান্ত ছিলেন এবং দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর একটি নার্সিংহোমে ভর্তি ছিলেন।
এরপরই অভিনেতা স্মরণ করেন জীবনের অন্যতম কঠিন একটি রাতের কথা। সেদিন শুটিংয়ের কাজ শেষ করে তিনি বাবাকে দেখতে নার্সিংহোমে গিয়েছিলেন। রাত তখন প্রায় আড়াইটা। বাবার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক। অম্বরীশের কথায়, তাঁর চোখের সামনেই প্রায় দেড় লিটার রক্তবমি করেছিলেন তাঁর বাবা। সেই দৃশ্য আজও তিনি ভুলতে পারেননি। ভয়ঙ্কর সেই মুহূর্তেও তাঁর বাবা একদৃষ্টে ছেলের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। মৃত্যুর এত কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষের সেই দৃষ্টি আজও তাড়া করে বেড়ায় অভিনেতাকে। বাবার কষ্ট, অসহায়তা এবং আসন্ন বিদায়ের ইঙ্গিত তিনি তখন স্পষ্টভাবে অনুভব করতে পারছিলেন।
আরও পড়ুনঃ মাত্র ২০০ টাকা ধার নিয়ে চোখে জল আটকে রাখতে পারেননি উত্তমকুমার! সেদিন সুব্রতা চ্যাটার্জীর কোন একটি কথায় প্রকাশ্যে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন স্বয়ং মহানায়ক? জানেন, কী এমন ঘটেছিল যে ধার নেওয়া সেই টাকা কোনওদিন ফেরত দিতে পারেননি তিনি?
সেই সময়ই অম্বরীশ বাবাকে একটি প্রশ্ন করেছিলেন, যা বহুদিন ধরে তাঁর মনের মধ্যে জমে ছিল। তিনি জানতে চেয়েছিলেন, “তুমি কেন এত মদ খেয়েছ জীবনে?” উত্তরে তাঁর বাবা শান্ত গলায় বলেছিলেন, “আনন্দ করে তো বাঁচলাম।” এই কয়েকটি শব্দ যেন জীবনের এক গভীর দর্শন তুলে ধরেছিল। বাবার সেই উত্তর শুনে অম্বরীশ আর কোনও প্রশ্ন করেননি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, জীবনের শেষ প্রহর এসে গিয়েছে। নিজের পছন্দমতো জীবন কাটানোর তৃপ্তি নিয়েই তাঁর বাবা বিদায় নিতে চলেছেন। সেই রাতেই বাবার মৃত্যু হয়। আজও সেই স্মৃতি মনে পড়লে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন অভিনেতা। তাঁর কথায়, বাবার শেষ উত্তরটি শুধু একটি বাক্য ছিল না, বরং ছিল জীবনকে নিজের মতো করে বাঁচার এক নিঃশব্দ স্বীকারোক্তি।






