সব্যসাচী চক্রবর্তী, বাংলা অভিনয় জগতের এক পরিচিত, শক্তিশালী নাম। কয়েক দশক ধরে মঞ্চ, ছোটপর্দা আর বড়পর্দায় নিজের উপস্থিতি দিয়ে দর্শকের মনে স্থায়ী আসন গড়ে তুলেছেন তিনি। তবু এত সাফল্যের পরেও যখন সব্যসাচী চক্রবর্তী নিজেই বলেন, “আমি ভালো অভিনেতা নই”, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—এ কথা কি নিছক বিনয়, নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে গভীর কোনও আত্মসমালোচনা? সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তাঁর এই মন্তব্য ঘিরেই শুরু হয়েছে আলোচনা।
থিয়েটার থেকেই সব্যসাচী চক্রবর্তীর অভিনয় জীবনের শুরু। দীর্ঘদিন মঞ্চে কাজ করার ফলে চরিত্রকে ভেতর থেকে ধরার এক বিশেষ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে তাঁর মধ্যে। পরে টেলিভিশন ও সিনেমায় সেই মজবুত ভিতই তাঁকে আলাদা পরিচিতি দেয়। ঘরে ঘরে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠার পরও তিনি মনে করেন, অভিনয়ে পৌঁছে যাওয়ার কোনও শেষ ধাপ নেই। বরং প্রতিটি চরিত্রই নতুন পরীক্ষা, নতুন লড়াই। আর সেই লড়াইয়ে তিনি নিজেকে এখনও শিক্ষার্থী বলেই ভাবতে ভালোবাসেন।
নিজেকে ছোট করে দেখা তাঁর অভ্যাস নয়, বরং শিল্পের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা থেকেই এমন মন্তব্য। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, সত্যিকারের বড় অভিনেতা কাদের বলে তিনি নিজের চোখে দেখেছেন। তাঁর কথায়, “ভালো অভিনেতা দেখেছেন? তুলসী চক্রবর্তী, নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকি, ইরফান খান, বিকাশ রায়—এঁরা এক অন্য পর্যায়ের অভিনেতা। আমি তাঁদের ধারে কাছেও পৌঁছোতে পারিনি।” এই স্বীকারোক্তিতেই যেন তাঁর শিল্পবোধের গভীরতা ধরা পড়ে।
এরপর তিনি বিশেষ করে তুলসী চক্রবর্তীর একটি দৃশ্যের কথা তুলে ধরেন। গরমে বিরক্ত হয়ে গামছা দিয়ে পিঠ মুছতে মুছতে শুধু কয়েকটি সংলাপ—“উফ, কী গরম! বাপরে, বাপরে”—এই সামান্য মুহূর্তকেই তিনি অসাধারণ বলে মনে করেন। শুধু ওই দৃশ্যটি দেখার জন্যই তিনি ছবিটি বারবার দেখেন বলে জানান। আবার একটি ছবিতে তুলসী চক্রবর্তী ও মলিনা দেবীর অভিনয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, স্বামীর পকেট থেকে প্রেমপত্র বেরিয়ে আসার পর স্ত্রীর অভিব্যক্তি, “চললে কোথায় শুনছো ওগো?”, কিংবা পরদিন স্বামীর মুখ শুকিয়ে যাওয়া দেখে স্ত্রীর সংলাপ—এই সূক্ষ্ম আবেগের প্রকাশই তাঁকে অভিভূত করে। তাঁর মতে, অভিনয়ের এই সংযম আর স্বাভাবিকতাই প্রকৃত শিল্পীর পরিচয়।
আরও পড়ুনঃ তনয় শাস্ত্রীর করা মামলায়, অবশেষে কাঠগড়ায় মিমি চক্রবর্তী! আদালত কি খুঁজে পাবে ন্যায়? ২ কোটি টাকার মানহানির লড়াই, কার হবে জয়?
এমন আত্মসমালোচনা আসলে তাঁর পেশাদার সততা ও দায়বদ্ধতারই প্রমাণ। সাফল্যের চূড়ায় থেকেও নিজেকে পূর্ণ মনে না করা, প্রতিনিয়ত শেখার ইচ্ছা রাখা—এই মানসিকতাই তাঁকে আলাদা করে দেয়। দর্শকের কাছে তিনি প্রতিষ্ঠিত তারকা হলেও, নিজের চোখে তিনি এখনও এক অনুশীলনরত অভিনেতা। আর হয়তো এই অদম্য শেখার মানসিকতাই তাঁকে আরও দীর্ঘদিন অভিনয়ের জগতে প্রাসঙ্গিক ও সম্মানিত করে রাখবে।






