বাংলার রাজনীতি আর বিনোদন এই দুই জগতের মেলবন্ধন নতুন কিছু নয়। বছরের পর বছর ধরে টলিউডের বহু অভিনেতা-অভিনেত্রী, গায়ক-গায়িকারা প্রকাশ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের পাশে দাঁড়িয়েছেন। রাজনৈতিক মঞ্চে তাদের উপস্থিতি যেমন চোখে পড়ার মতো, তেমনই ভোটের সময় তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। কিন্তু ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির বিপুল জয়ের পর সেই সমীকরণ যেন নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে শিল্পীদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে এখন জোর বিতর্ক শুরু হয়েছে, তা কি সত্যিই ব্যক্তিগত মত, নাকি ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার এক কৌশল?
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে এসেছেন জনপ্রিয় গায়িকা ইমন চক্রবর্তী। জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত এই শিল্পী শুধু গানেই নয়, সাম্প্রতিক সময়ে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও সরব ছিলেন। ভোটের আগেই তিনি ফেসবুক লাইভে এসে নিজের মানসিক যন্ত্রণা এবং ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে এক ব্যক্তিগত আঘাতের কথা, যা ধীরে ধীরে রাজনৈতিক বিতর্কের রূপ নেয়। একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত জীবনের ট্র্যাজেডি কীভাবে সোশ্যাল মিডিয়ার নির্মম ট্রোলিংয়ের শিকার হতে পারে তারই এক উদাহরণ যেন এই ঘটনা।
ইমন জানান, রাজ্য সরকারের উন্নয়ন নিয়ে একটি পাঁচালি গাওয়ার পর থেকেই তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় একাংশের কটাক্ষের মুখে পড়েন। তবে পরিস্থিতি চরমে পৌঁছয় যখন তাঁর মায়ের মৃত্যুদিবসে করা একটি আবেগঘন পোস্টেও কুরুচিকর মন্তব্য করা হয়। সেই আঘাতে তিনি সোশ্যাল মিডিয়া ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর কথায় আবার ফিরে আসেন এবং প্রকাশ্যে তৃণমূলের সমর্থনে ভোট প্রচারেও অংশ নেন। তাঁর সেই মন্তব্য “প্রত্যাবর্তন কতটা প্রয়োজন জানি না, কিন্তু প্রত্যাঘাত প্রয়োজন” তখন রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই দেখা হয়েছিল।
ভোটের দিনও ইমন নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন। ভোট দিয়ে বেরিয়ে তিনি বলেন, “বাংলার বিরুদ্ধে যা যা দেখেছি, তার জবাব দিয়ে এসেছি।” এই বক্তব্য থেকেই বোঝাই গিয়েছিল, তিনি সরাসরি তৃণমূলকেই সমর্থন করেছেন। এমনকি ভোটের কয়েকদিন আগে থেকেই রাজ্যে কেন্দ্রীয় প্রভাব নিয়ে তাঁর মন্তব্যও বিতর্ক তৈরি করেছিল। সব মিলিয়ে, একজন শিল্পী হিসেবে তাঁর মত প্রকাশের অধিকার থাকলেও, তা কতটা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত সেই প্রশ্ন উঠতেই থাকে।
আরও পড়ুনঃ “এই মুহূর্তেই পদত্যাগ চাই” ইমপা অফিসে গেরুয়া আবির ও গঙ্গাজল ছিটিয়ে শুদ্ধিকরণ প্রযোজকদের! বাংলায় রাজনৈতিক পালাবদল হতেই, টলিপাড়ায় বদলাচ্ছে ক্ষমতার সমীকরণ? পিয়া সেনগুপ্ত এবং স্বরূপ বিশ্বাসের নামে থানায় দায়ের লিখিত অভিযোগ?
তবে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার নির্বাচনে বিজেপির এই বিপুল জয়ের পর ইমনের সেই অবস্থান এখন নতুন করে সমালোচনার মুখে। একদিকে ব্যক্তিগত আঘাত ও মানসিক যন্ত্রণার কথা তুলে ধরা, অন্যদিকে প্রকাশ্যে একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষে প্রচার এই দুইয়ের মিশ্রণ অনেকের কাছেই অস্বস্তিকর মনে হয়েছে। সমালোচকদের মতে, একজন শিল্পীর উচিত ছিল নিরপেক্ষ থাকা, বিশেষ করে যখন তাঁর ব্যক্তিগত দুঃখকে রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। আবার অন্যদের মতে, সোশ্যাল মিডিয়ার বিষাক্ত পরিবেশই তাঁকে এই অবস্থানে ঠেলে দিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায় শিল্পীর কণ্ঠ কি শুধুই শিল্পের জন্য, নাকি তা রাজনীতির হাতিয়ার হয়ে উঠছে?






