দীর্ঘদিন ধরেই বাংলার বুদ্ধিজীবী মহলে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়ে আসছে, অভিনেত্রী অপর্ণা সেনের (Aparna Sen) রাজনৈতিক আর সামাজিক অবস্থান। সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের সময় তিনি যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, তা কেবল প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি শিল্পায়ন এবং মানুষের অধিকারকে কেন্দ্র করে সরাসরি নৈতিক অবস্থান নেন। তখনকার বুদ্ধিজীবী মঞ্চে তার সক্রিয় ভূমিকা এবং স্পষ্ট মতামত দেখিয়েছে, যে কোনও ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্বার্থ তাকে প্রভাবিত করতে পারে না। শিল্প আর সমাজের মধ্যে যে সীমারেখা থাকা উচিত, তা রক্ষা করাই ছিল তাঁর মূল উদ্দেশ্য।
মানুষকে জোরপূর্বক ভূমি থেকে বঞ্চিত করে কোনও উন্নয়ন সম্ভব নয়, এই দৃষ্টিভঙ্গি তখনই সেই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে তিনি প্রকাশ করেছিলেন। তবে, বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অপর্ণা সেনের রাজনীতির প্রতি মনোভাবের পরিবর্তন যেন নতুন করে প্রশ্ন জাগিয়েছে! সম্প্রতি নিবেদিতা অনলাইনের তরফে নেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন যে, নাগরিক সমাজের প্রতি তাঁর আস্থা এখনও আছে, কিন্তু রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি তার আস্থা নেই বললেই চলে! রাজ্যের কোনও রাজনৈতিক দল তাঁকে সরাসরি সমর্থন বা নিযুক্ত করেনি, এবং এই কারণেই তিনি অনেক সময় নিরপেক্ষ থেকেছেন।
তাঁর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে অভিজ্ঞতার সঙ্গে মানুষের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির প্রতি তার ধ্যান-ধারণা আরও কঠোর হয়ে উঠেছে। তিনি মনে করেন, স্বতন্ত্র বুদ্ধিজীবী হওয়া মানে শুধু কোনও দলের পৃষ্ঠপোষকতা নেওয়া নয়, বরং ন্যায়ের পক্ষে স্পষ্টভাষী থাকা! এদিন তিনি যে মত প্রকাশ করেছেন, তা নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তিনি বলেছেন, পরিবর্তনের সময় যাদের নেতৃত্বে আশা ছিল, আজ সেই আশা নিয়ে তিনি কিছুটা হতাশ! বক্তব্যে আরও উঠে এসেছে, রাজনৈতিক দলের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং ক্ষমতার অপব্যবহার অনেকটা তার প্রাথমিক বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তিনি বলেন, “যে যায় লঙ্কায়, সেই হয় রাবণ… প্রকৃত হিন্দুত্ববাদ কারোর মধ্যে নেই, সবাই চায় নিরপেক্ষতা। বাম আমলেও আমি খারাপের সমালোচনা করেছি, এই আমলেও করছি। তবে রাজ্যের লোকের অবশ্যই কিছু ক্ষোভ জন্মেছে এই সরকারের প্রতি। তাদের সিদ্ধান্ত কিভাবে সেটা তো বলতে পারব না। তবে, মুখ্যমন্ত্রী একবার বলেছিলেন ‘বিরোধী শূন্য করে দেব’ এই কথাটা অত্যন্ত অনৈতিক। বিরোধী ছাড়া স্বৈরাচারিতা বৃদ্ধি পায়, শাসনের মূল্য কমে যায়। বিজেপি যেভাবে রাজ্যে সক্রিয় হয়ে উঠেছে, একটা ট্রাকের সঙ্গে সাইকেলের তুলনার সমান।
আরও পড়ুনঃ আসছে রণজয় বিষ্ণুর নতুন ধারাবাহিক ‘প্রতিজ্ঞা’, প্রোমোতেই ফেলেছে দুর্দান্ত সাড়া! ‘গাঁটছড়া’র খড়িদ্ধি জুটি ফিরে এসেও ম্যাজিক ফেরাতে ব্যর্থ! তবে কি সত্যিই তিন মাসে শেষ হচ্ছে ‘মিলন হবে কত দিনে’? কী জানালেন গৌরব চট্টোপাধ্যায়?
বিজেপির কাছে যে পরিমাণ ক্ষমতা আর সুযোগ আছে, রাজ্যের শাসকদলের জন্য সেটা কিন্তু চিন্তার বিষয়।” রাজনৈতিক দলের প্রতি অনাসক্ত থাকলেও, সামাজিক ন্যায়ের জন্য যেকোনও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর গুরুত্ব এখনও অটুট। এই নৈতিক দৃঢ়তা তাকে বুদ্ধিজীবী মহলে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। তিনি শুধু বিরোধীতা নয়, বরং নৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন। রাজনীতিতে অনাস্থা থাকা সত্ত্বেও, তিনি কখনও চুপ থাকেননি। এটাই তাকে বিশেষ করেছে এবং একই সঙ্গে বিতর্কও তৈরি করেছে। বাংলার বুদ্ধিজীবী মহলে তার এই স্পষ্টভাষী এবং নৈতিক অবস্থান আজও প্রজন্মের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।






