বর্তমান সময়ে বিনোদন জগতের অন্দরমহলে কী চলছে, তা আর কারও অজানা নয়। বিশেষ করে টলিউডে এখন রাজনীতির প্রভাব এবং অর্থবল এই দুইয়ের দাপটই যেন ঠিক করে দিচ্ছে কোন ছবি প্রেক্ষাগৃহে জায়গা পাবে আর কোনটি পাবে না। অনেকেই বলছেন, শুধু ভালো ছবি বানালেই হবে না, দরকার বড় প্রযোজক, শক্তিশালী লবি কিংবা বিপুল প্রচারের বাজেট। অর্থাৎ, প্রতিভার পাশাপাশি এখন প্রেক্ষাগৃহে জায়গা পাওয়ার জন্য ‘ক্ষমতা’ই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি। এই বাস্তবতায় অনেক স্বাধীন পরিচালকই পড়ছেন চরম সমস্যায়, তাঁদের সৃষ্টিকে দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই যেন বড় চ্যালেঞ্জ।

এই প্রেক্ষাপটেই উঠে আসছে পরিচালক প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য-এর ছবি ‘নধরের ভেলা’-র কথা। ছবিটি একাধিক আন্তর্জাতিক ও দেশীয় চলচ্চিত্র উৎসবে প্রশংসা কুড়িয়েছে। কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব-এ প্রদর্শনের পর দর্শকদের কাছ থেকেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পেয়েছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এত প্রশংসা সত্ত্বেও ছবিটি বাংলার প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়নি। বরং বিদেশের বিভিন্ন ফেস্টিভ্যাল ও প্রদর্শনীতে দর্শকরা ছবিটি বড় পর্দায় দেখেছেন এবং প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছেন। প্রশ্ন উঠছে বাংলার ছবিকে কেন বাংলাতেই এমন লড়াই করতে হচ্ছে?
আরও পড়ুনঃ “শ্রী শমীক ভট্টাচার্যের ফ্যান আমি” দাবি করেছিলেন ইমন চক্রবর্তী! “এমন চেহারা…আমার দলের ফ্যান হলে ভালো” এবার প্রতিক্রিয়া দিলেন, বিজেপির রাজ্য সভাপতি! গায়িকাকে রাজনীতি নিয়ে, দিলেন কোন পরামর্শ?
‘নধরের ভেলা’-র মুক্তির ঘটনাই যেন এই প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে। প্রেক্ষাগৃহ না পেয়ে ছবিটি মুক্তি পেয়েছে নাট্যমঞ্চে, দক্ষিণ কলকাতার তপন থিয়েটারে। এমনকি টিকিট বিক্রি থেকে দর্শকদের বসার ব্যবস্থা সবকিছুতেই অংশ নিয়েছেন পরিচালক ও শিল্পীরা নিজেরাই। কারণ একটাই পরিবেশক বা বড় প্রযোজকের সমর্থন না পাওয়া। প্রদীপ্ত নিজেই জানিয়েছেন, পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় এবং বাণিজ্যিক শর্তে আপস করতে না চাওয়ায় তিনি এই পথ বেছে নিয়েছেন। অথচ একই সময়ে, এই ছবিই বিদেশে সম্মান পাচ্ছে, দর্শক টানছে যা বাংলার চলচ্চিত্র ব্যবস্থার একটি বড় বৈপরীত্য তুলে ধরে।

অন্যদিকে, টলিউডের বাণিজ্যিক ছবির ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছবি দেখা যাচ্ছে। দেব ও শুভশ্রী গাঙ্গুলির আগামী ছবি ‘desu 7’ (দেসু ৭) এখনও নাম, গল্প কিছুই চূড়ান্ত না হলেও ইতিমধ্যেই প্রেক্ষাগৃহে তার টিকিট বুকিং শুরু হয়ে গিয়েছে। শুধু সাধারণ বুকিং নয়, ‘গোল্ডেন টিকিট’ পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে আগেভাগেই। অর্থাৎ, যেখানে একটি তৈরি, প্রশংসিত বাংলা ছবি প্রেক্ষাগৃহ পায় না, সেখানে এখনও নির্মাণপর্বে থাকা ছবির জন্য আগাম বুকিং এই বৈপরীত্যই এখন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। প্রশ্ন উঠছে, তবে কি শুধুমাত্র তারকা, প্রভাব এবং অর্থের জোরেই নির্ধারিত হচ্ছে কোন ছবি দর্শকের সামনে আসবে?

এই পরিস্থিতিতে ‘নধরের ভেলা’ যেন এক প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে, স্বাধীন চিন্তা, সংগ্রাম এবং বিকল্প পথের। কিন্তু একই সঙ্গে এটি টলিউডের বর্তমান বাস্তবতাকেও নগ্ন করে দিচ্ছে। যদি বাংলার মাটিতে বাংলার ছবিই জায়গা না পায়, তবে ভবিষ্যতে নতুন পরিচালক বা ভিন্নধর্মী কনটেন্টের কী হবে? আজকের এই প্রশ্নই হয়তো আগামী দিনের বাংলা সিনেমার দিশা নির্ধারণ করবে।






