টলিউডে শোকের আবহ এখনও কাটেনি। মার্চের শেষ সপ্তাহে ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা যেন গোটা ইন্ডাস্ট্রিকেই স্তব্ধ করে দিয়েছে। কাজের মাঝখানে হঠাৎ এমন ঘটনা, যা মেনে নেওয়া কঠিন শুধু সহকর্মীদের জন্য নয়, দর্শকদের কাছেও। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিদিনই উঠে আসছে নানা স্মৃতি, নানা প্রশ্ন। ঠিক কীভাবে এই দুর্ঘটনা ঘটল, কেনই বা এমন হল, এই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এখনও চলছে তদন্ত।
গত ২৯ মার্চ, রবিবার, ওড়িশার তালসারির সমুদ্রতটে শুটিং করতে গিয়ে জলে তলিয়ে যান জনপ্রিয় অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়। ‘ভোলে বাবা পার কারেগা’ ধারাবাহিকের শুটিং চলাকালীন এই দুর্ঘটনা ঘটে বলে জানা যায়। ঘটনার পর থেকেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ওই ধারাবাহিকের কাজ। প্রযোজনা সংস্থার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপও শুরু হয়েছে। ইন্ডাস্ট্রির ভেতরে এবং বাইরে, সর্বত্রই এখন এই ঘটনা নিয়ে আলোচনা। অন্যদিকে, ব্যক্তিগত জীবনে নেমে এসেছে গভীর অন্ধকার। অভিনেতার মা বারবার অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, আর স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকার ছোট ছেলে সহজকে নিয়ে এক কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন।
এই ঘটনার মাঝেই নতুন করে সামনে আসছে রাহুলের ব্যক্তিগত জীবনের নানা অজানা দিক। অনেকেই জানতে চাইছেন তাঁর পারিবারিক পটভূমি নিয়ে বিশেষ করে তাঁর বাবার কথা। কারণ, অভিনয়ের প্রতি রাহুলের আগ্রহ ও যাত্রার পেছনে তাঁর পরিবারের প্রভাব ছিল গভীর। ছোটবেলা থেকেই তিনি নাটকের পরিবেশে বড় হয়েছেন, মঞ্চ ছিল তাঁর প্রথম ভালোবাসা। মাত্র তিন বছর বয়সে অভিনয়ে হাতেখড়ি, তারপর ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠা এই পথটা মোটেই সহজ ছিল না। টেলিভিশন থেকে সিনেমা প্রতিটি ধাপে নিজেকে প্রমাণ করতে হয়েছে তাঁকে। ২০০০ সালে মিঠুন চক্রবর্তী অভিনীত ‘চাকা’ ছবিতে প্রথম সুযোগ পান, এরপর ধীরে ধীরে এগিয়ে চলা। তবে আসল সাফল্য আসে ২০০৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’’ ছবির মাধ্যমে, যা তাঁকে রাতারাতি জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছে দেয়।
এই সাফল্যের গল্পের পিছনেই লুকিয়ে রয়েছে এক আবেগঘন অধ্যায় তাঁর বাবা বিশ্বনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর গল্প। তিনি ছিলেন এক প্রখ্যাত নাট্য অভিনেতা, পরিচালক ও প্রযোজক। বহু বছর ধরে থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং নিজের দল ‘বিজয়গড় আত্মপ্রকাশ’-এর মাধ্যমে অসংখ্য কাজ করেছেন। রাহুলের অভিনয়ের প্রথম পাঠও বাবার হাত ধরেই। কিন্তু ছেলের সাফল্যের মধ্যেই যেন তাঁর জীবনে নেমে আসে এক অদ্ভুত ট্র্যাজেডি। একটি নাটকের মঞ্চে অভিনয়ের সময়, হঠাৎ রাহুল সেখানে উপস্থিত হন। তখন সদ্য মুক্তি পেয়েছে ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’ তাঁকে ঘিরে দর্শকদের উন্মাদনা ছিল তুঙ্গে। মঞ্চ ছেড়ে দর্শকদের নজর ঘুরে যায় সিনেমার নায়কের দিকে, শুরু হয় হুড়োহুড়ি।
আরও পড়ুনঃ নববর্ষের প্রাক্কালে দারুন খবর! আবার ছোটপর্দায় ফিরছে বহুল প্রতীক্ষিত, ‘মেয়েবেলা’র ‘মৌঝর’ জুটি! নতুন ধারাবাহিকের সুখবর দিলেন স্বীকৃতি ও অর্পণ? দেখা যাবে কোন চ্যানেলে?
এই ঘটনাই বদলে দেয় অনেক কিছু। মঞ্চাভিনয় থামিয়ে দিতে বাধ্য হন শিল্পীরা। একজন থিয়েটার ব্যক্তিত্ব হিসেবে এই পরিস্থিতি মেনে নিতে পারেননি বিশ্বনাথবাবু। তাঁর কাছে মনে হয়েছিল, মঞ্চ যেন হেরে গেল পর্দার কাছে। এই মানসিক ধাক্কা এতটাই প্রবল ছিল যে, কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি কোমায় চলে যান। দীর্ঘদিন সেই অবস্থায় থাকার পর ২০২১ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। বাবার এই পরিস্থিতির জন্য নিজেকে দায়ী করতে শুরু করেছিলেন রাহুল। কিছুদিনের জন্য অভিনয় থেকেও সরে দাঁড়ান তিনি। পরে পরিবার বিশেষ করে মা ও স্ত্রীর অনুপ্রেরণায় আবার কাজে ফেরেন। কিন্তু আজ, সেই মানুষটিই আর নেই। তাই তাঁর জীবনের গল্প শুধু একজন অভিনেতার সাফল্যের নয়, বরং এক পরিবারের সংগ্রাম, ভালোবাসা আর হারানোর বেদনায় ভরা এক বাস্তব কাহিনি।






